অন্ধকারে কে?, আগাথা ক্রিস্টি

অন্ধকার রাত। জাহাজ এখন উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে। জাহাজের বর্তমান অবস্থান বলা যাচ্ছে না, কুয়াশায় সূর্য লুকিয়ে আছেন। কুয়াশা মাস্তুল ঘিরে শুরু হয়ে নিচে নেমে একেবারে বিস্তৃত সমুদ্রকেই আড়াল করে রেখেছে। বাতাস বইছে না। হালের হাতলটা সোজা রেখে ডেকের উপরে আমি একা, তিনজনের নাবিক দল–দুজন পুরুষ, একজন নেহায়েত নবযুবা। যে যা কেবিনে ঘুমোচ্ছে। উইল এই বাহনের কান্ডারী, আমার বন্ধুমানুষ। জাহাজের পিছনের অংশে বাঁ দিকের কেবিনের সে শুয়ে চিৎপটটাং।
হঠাৎ সেই তমসাচ্ছন্ন কুয়াশার মধ্যে ভেসে এলো একটা কন্ঠস্বর, “জাহাজে কি কেউ আছেন?“ আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কথাটি ভেসে এলো আবারও, সেই একই কন্ঠস্বর, বললো, সে একজন বৃদ্ধা মানুষ। একটু থেমে নিয়ে সে নির্ভয়ের আশ্বাস দিল।
কথার মাঝখানে ওই থামাটুকু আমার কানে বাজালো, এর প্রকৃত অর্থ অনেক পরে বুঝেছিলাম। সেই অদৃশ্যের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলাম যে তাহলে জাহাজের কাছে আসছে না কেন? উত্তরে জানালো তাতেআ আমাদের মঙ্গল। তারপরপরই সব চুপচাপ, নিরব, নিঝুম চতুর্পাশ। এবার আমিই জানতে চাইলাম, “ আপনি কোথায়?“ কোনো উত্তর নেই। সন্দেহ জেগে উঠলো মনে। অন্ধকার রাত, সমুদ্রের অজানা জায়গা; ভয় লাগছে, কাঠের পাটাতনে পা ঠুকে ঠুকে নিচের কেবিনে শোওয়া উইলকে জাগাবার চেষ্টা করলাম। ডেকেরএক ধারে হলদেটে আলোর ঝিলিক দেখা গেলো সেই অসীম সমুদ্রের পানিতে। কানে এলো ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর অস্ফুট চিৎকার, সেই কন্ঠস্বর!
কেউ যেন অন্ধকার সমুদ্রে বৈঠা চালাচ্ছে। আমি বললাম, এটা কোন ধরনের ঠাট্টা। রাতের অন্ধকারে নৌকার বৈঠা বেয়ে এগিয়ে যাবার অস্পষ্ট শব্দ। ডেকের দরজার দিক থেকে কানে এলো উইলের কণ্ঠস্বর, “জর্জ কি হয়েছে?“
আমি উইলকে পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম। উইল অন্ধকারে তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করল। কোনো উত্তর না পেয়ে শেষে ধমকে ওঠে, “ কে, নৌকায় কে?“ দুবার প্রশ্ন করবার পর উত্তর এলো।
“বলছি, আগে আলোটা সরিয়ে নিন।“
উইলের নির্দেশে আমি আলো সরিয়ে নিলাম। উইল লোকটাকে কাছে আসতে বলল। আবারও বৈঠার শব্দটা কানে আসছে। তারপর এগিয়ে এসে আনুমানিক ছয় সাত গজ দূরে শব্দটা থামলো। উইল বলল, “জাহাজের পাশে আসুন। এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।“ কন্ঠস্বর শর্ত দিলো: আলো ফেলা যাবে না। আমি এর কারণ জানতে চাইলাম। উইল আমার কাঁধে হাত রাখলো। আমি থেমে গেলাম।
উইল বলল, “এতো বড় অদ্ভুত কথা। আপনি হঠাৎ কোথা থেকে ইদয় হলেন, আপনার মনের মধ্যে কি আছে সেটা বোঝা যাবে না? আপনি বললেন আপনি একা, সেটা না দখে বিশ্বাস করবো কি ভাবে? আলোতে আপনার আপত্তি কেনো?
কথা শেষ হতেই আবার বৈঠার ছপছপ শব্দ কানে আসলো। ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। এবার অনেক দূর থেকে ভেসে এলো কণ্ঠস্বরটা; আর্ত, করুণ, পরিশ্রান্ত, হতাশ কন্ঠস্বর।
বললো, এভাবে তাদের বিরক্ত করবার জন্য সে ভীষণ দুঃখিত; তবে আসলে সে ভীষণ ক্ষুধার্ত।
উইল তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলে যে, তাকে সে তাড়িয়ে দিতে চায়নি। ঠিক আছে তিনি চাইছেনই না আলোন সামনে আসতে, তাহলে আমরা আলো সরিয়ে রাখছি।
উইলেআমাকে বললো, “অদ্ভুত ব্যাপার, তবে মনে হয় না ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছু হতে পারে।“
বললাম, “আমারো তা-ই মনে হয়, বোধহয় কোনো একজন ভদ্রলোকই হবেন। বেচারা জাহাজডুবি হয়ে আশেপাশে কোথায় উঠেছে জীবন নিয়ে, কয়েক দিন হয়তো অনাহারে কাটাচ্ছে, পাগল হয়ে উঠেছে।“
উইলের কথামতো আলোটা সরিয়ে রাখলাম। আলোটা রেখে ফিরে এলাম উইলের পাশে। রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়ে কান পাতলাম। দশ কি বারো গজ দূরে এসে বৈঠার শব্দ থামল।
লোকটিকে কাছে আসার জন্য অনুরোধ করলাম আমরা। কন্ঠস্বর জানালো যে, তাদের কাছে সে খাবার চাইছে ঠিকই তবে দাম দেবার ক্ষমতা তার নেই। উইল বলল, “যত খুশি খাবার আপনি নিয়ে যান।“
কন্ঠস্বর শোনা গেলো, “ঈশ্বর নিশ্চয়ই আপনাদের এর পুরস্কার দেবেন।“
উইল বলে উঠলো, “কার কথা বলছেনআপনি, তাকে ঠিক দেখি নি ত!“
কন্ঠস্বর জানালো যে, সে তার প্রেমিকাকে একা দ্বীপে রেখে এসেছে। দ্বীপের নামটা তার জানা নেই। সে অত্যন্ত দায়ে পড়ে এসেছে।
দুহাতে খাবার নিয়ে উইল ফিরে এলো রেলিংয়ে কাছে । লোকটাকে বললো জাহাজের পাশে আসতে । তার গলায় বন্ধুত্বের আহ্বান, বেচারী বৃদ্ধ মানুষটা এই ঘন অন্ধকারে যে সব জিনিষের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে সেগুলোই এখন উইলের হাতে। তবুও সে কোন ভয়ে আমাদের জাহাজের পাশে আসছে না! অদম্য ইচ্ছার টুটি টিপে ধরে সে সংযত করে রেখেছে নিজেকে। না সে পাগল তো নয়-ই বরং অসহ্য আতঙ্কের মুখোমুখি মানুষ।
উইল বলল, একটা বাক্স নিয়ে সাগরে নামিয়ে দিতে যেন ওটা ভাসতে ভাসতে লোকটার কাছে চলে যায়। দিলাম। কান পেতে রয়েছি আমি, ক্ষানিকপর দূরে চিৎকার শুনতে পেলাম। বুঝলাম বাক্সটা পেয়েছে সে। অন্ধকারে এতক্ষণ যার সাথে কথা হচ্ছিল, সেই কন্ঠস্বর এবার আমাদের মঙ্গল কামনা করে বিদায় নিলো।
বলাবলি করছিলাম, মনে হয় লোকটা আবার ফিরে আসবে!
উইল বলল, “এতবছর মাছ ধরছি এরকম অদ্ভুত ঘটনা আমার কাছে এই প্রথম!“
রাত এগিয়ে যাচ্ছে ভোরের দিগে। আমাদের চোখে ঘুমের লেসমাত্র ছিটে ফোঁটাও নেই।
ঘণ্টা চারেক পর সমুদ্রে বাতাসের হু হু আওয়াজের মধ্যে আবারও সেই বৈঠার শব্দ শোনা গেল। বোঝা যাচ্ছে সে ফিরে আসছে। বৈঠায় শব্দ শুনছিলাম। কাছে এসে শব্দটা থামলো। অন্ধকারে সেই কন্ঠস্বর ভেসে এলো; আমাদেরকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তখুনি তাই সে ভীষণ দুঃখ প্রকাশ করলো। তার প্রেমিকার জন্য তার খুব তাড়া ছিল। সে আমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সে বলে চলল, আমি আর আমার প্রিয়তমা আপনাদের উপকারের কথা নিয়ে আলোচনা করেছি।
একটু থেমে নিয়ে আবার শুরু করে, আমরা আমাদের জীবনের কথা কারোকে বলতে চাইনি তবু আপনাদের বলছি:
‘এ কাহিনীর শুরু সেদিন যেদিন অ্যালবাট্রসের সমুদ্রসমাধি হয়। যে জাহাজটা নিউক্যাসল থেকে সান ফ্রান্সিসকো রওনা হয়ে যায়।
‘উত্তর দিকে জাহাজটা এক ঝড়ের পাল্লায় পড়ায় মাস্তুল ভেঙ্গে যায়। ভোর হলো দেখা গেল জাহাজ ফুটো হয়ে গেছে। ফুটো দিয়ে তোড়ে পইন ঢুকছে। চারিদিক ক্ৰমে থমথমে হয়ে উঠেছে। নাবিকরা যে যার নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নৌকা নামালো সাগরে। তখন সেই ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকলাম আমরা দুজন, আমি আর আমার সঙ্গিনী। সবাই নেমে যাচ্ছে সেই নৌকাতে। সে দিকে খেয়াল করি নি। আমরা তখন জিনিষপত্র গোছগাছ নিয়ে তুমুল ব্যাস্ত। কেউ আর আমাদের ডাকেও নি; সেই মহা বিপদে, ভীষণ আতঙ্ক তাদের নির্দয় করে তুলেছিল।
‘ডেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম, দিগন্ত রেখা একটা কালো দাগ মাত্র। আমরা তড়ি ঘড়ি করে অনেক কষ্টে সিস্টে একটা কাঠের ভেলা বানিয়ে ফেললাম। সাথে প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিষ নিয়ে, জাহাজের খাদ্য ভান্ডর থেকে শুকনা জাতিয় কিছু খাবার আর পানীয় পানি সঙ্গে নিয়ে ভেলায় চড়ে বসলাম। দেখতে পাচ্ছি আমাদের জাহাজ অনেকটা তলিয়ে গেছে। রওনা দিলাম লক্ষ্যহীন উদ্দেশ্যের দিকে ।
‘কিছুক্ষণ পরেই খেয়াল করলাম আমরা স্রোতের খেয়াল খুশী মতে ভাসছি। স্রোত ক্রমেই ভেলাটাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই ডুবন্ত জাহাজটার কাছ থেকে অনেক দূরে । এক টুকরো কাঠ দিয়ে দুটো বৈঠা বানিয়ে নিয়েছি বটে দু জনেই, তবে তা এখন কোনো কাজ করছে না। করার কিছুই নেই তাকিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া।
‘সাগরের বাতাস আর তার ঘুম-পাড়ানি এক-ঘেয়ে সুরে বয়ে যাওয়ার আওয়াজ, তার ওপর ক্লান্ত শরীর, নিষ্ক্রিয় মগজ তদুপরি হতাশা সব মিলিয়ে কখন বুঝি একটু চোখটা লেগেএসেছিল। আনুমানিক প্রায় তিনঘণ্টা পর দেখলাম, অনেক দূরে আমাদের জাহাজটা। গোটা জাহাজটা ডুবে গেছে মাস্তুল তখনও সমুদ্রের উপরে। আরো কয়েক ঘণ্টা পর সেটাও গেলো পানির তলায়। সমুদ্রে সন্ধ্যা নামে, কুয়াশা ঢেকে ফেলে সমুদ্রটাকে। রাত কাটে আস্তে ধীরে, ভোর হয়। কুয়াশা সরেনি, বাতাস বেশ ঠান্ডা।
‘অদ্ভুত ধোঁয়াটে জীবন; চারদিন নিছক বসে থাকলাম ও ভাবেই। অবশেষে চারদিনের মাথায় তখন সূর্য পাটে যাওয়ার আয়োজন করছে এমন সময়ে কানে এলো ঢেউয়ের হাসি, তটের সাথে ধাক্কা খেয়ে খলখল করে হেসে ওঠার শব্দ।
‘আবিষ্কার করলাম: কুয়াশা ভেদ করে প্রকাণ্ড এক জাহাজের ইস্পাত কলেবর। আশার আলো দেখে হেসে উঠলাম, প্রাণ ফিরে পাওয়া চিৎকার করলাম, আমাদের কপালের শনির দশা এবার কাটবে। কিন্তু তখনও দুর্দশার অনেক বাকি।
‘আমাদের ভেলাটা জাহাজের গায়ে গিয়ে লাগলো। জাহাজের পাশে একটা দড়ি ঝুলছিল।ওটা বেয়ে উঠলাম। সমুদ্রে সন্ধ্যা অনেক দীর্ঘ তবে এবার যে কোনো মুহূর্তে সূর্য একেবারেই তলিয়ে যাবে।
‘ওপরে পৌঁছে রেলিং ডিঙিয়ে জাহাজের ডেকে নামলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল জাহাজের লোকেদের ডেকে সাহায্য চাওয়া। অনেক চিৎকারেও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। তখন জাহাজের পেছনে গেলাম। নিচের দরজাটা খুলে উঁকি মারতে একটা বীভৎস পচা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম ভিতরে সকলে মৃত। নিজেকে হঠাৎ খুব একা বলে মনে হলো।
‘আমার বাগদত্তা –জেফরী চুপ করে বসেছিল। আমাকে দেখে সে বলল, “জাহাজে কারো সাথে কথা হলো? বললাম, “জাহাজে কেউ নেই।“ মনে হলো ও কথাটা বিশ্বাস করছে না! একটু অপেক্ষা করলে একটা মই খুঁজে নিয়ে ওকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারি । কপাল ভালো, ডেকের অন্য দিকে একটা দড়ির মই খুঁজে পেলাম। ওটা নিচে ঝুলিয়ে দিয়ে ওকে উপরে নিয়ে আসলাম।
‘আমরা কেবিন ও অন্যান্য ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু প্রাণের স্পন্দন পাওয়া গেল না। কেবিনের সব জায়গায় ফাংগাসের ঝাড়-ঝোপ গজিয়ে আছে।ও বলল এসব পরিষ্কার করা যাবে।
তারপর আমরা জাহাজের পেছনে চলে গেলাম দেখতে। দুজনে মিলে একখানা কেবিন বেছে বেছে বের করে নিয়ে ঘসে মেজে পরিষ্কার করার কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। সাগরে ভেসে বেড়ানোর চাইতে ভূতের আখড়ার মধ্যে শুয়ে ঘুমোনো বরং অনেক ভালো মনে হচ্ছিল তখনও।
তারপর জাহাজে আমরা খাবার খুঁজে বেড়ালাম এবং পেলাম। খাবার পানির পাম্পটা মেরামতের চেষ্টা করলাম, আমি সৌখিন মিস্ত্রি। একটু চেষ্টাতেই পাম্পটা সারিয়ে তুললাম যাতে খাবার পানির কোনো সমস্যা না হয়।পানি উঠলো তবে তার স্বাদটা যথেষ্ট সুপেয় নয়। বেশ কদিন থাকলাম। কিন্তু আমরা তখনও অনুমান করতে পারি নি আমাদের অভিশপ্ত ভবিষ্যতের কথা।
কেবিনের দেওয়াল, মেঝে থেকে ফাংগাস পরিষ্কার করে ফেলেছিলাম কিন্তু এবার অবাক হয়ে দেখলাম, মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় সেগুলো আগের জায়গায় ফিরে এসেছে।এবার কার্বলিক অ্যাসিড দিয়ে ওগুলো নির্মূল করে ফেললাম; সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে আগের জায়গাতে ফিরেও এসেছে বরং আরো অনেক ছড়িয়ে পওড়ছে। মনে হচ্ছে যেন আমরা হাত দেবার ফলে ওগুলো থেকে অসংখ্য বীজ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে।
আরো সাতদিন পর দেখা গেল মাথার কাছে ওর বালিশে ফাংগাস। দেখেই মনস্থির করে ফেললাম, ঐ মুহূর্তে জাহাজ ছেড়ে চলে যাবো। মনে হলো পানির চাইতে ডাঙায় ভালো করে বাঁচতে পারবো।
নিজেদের সামান্য যা কিছু আছে সব গুছিয়ে নিলাম। ওর গয়ের শালের মধ্যে লেগ থাকা ফাংগাসগুলো আমি নিজের হাতে ঝেড়ে ঝেড়ে ফেলে দিলাম।
ভেলাটা জাহাজের গায়ে ভাসছিল, ওটা চালাতে অসুবিধে হবে তাই জাহাজের ডেক থেকে একটা ছোট নৌকো সমুদ্রে নামালাম। নৌকায় আমরা ডাঙার দিকে এগোচ্ছি, ডাঙার কাছাকাছি আসতে দেখলাম ফাংগাস দূষিত রাজত্ব অবাধে বিস্তার করেছে, কোনো কোনো জায়গায় ওগুলো বীভৎস অকল্পনীয় টিবির মতো হয়ে আছে। স্থির গাছের পাতা বাতাসে যেমন কেঁপে ওঠে, সেগুলো থরথর করে কাঁপছে। কোথাও কোথাও তো সেগুলোর শরীর মোটা আঙুলের মতো; কোথাও কোথাও সমতলে মসৃণভাবে বিশ্বাসঘাতী রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
তীর ধরে বেশ কিছুক্ষণ নৌকো বেয়ে যেতে যেতে আমাদের একটা ভুল ভাঙ্গলো; ভেবেছিলাম আমরা এখন ফাংগাসের আক্রমণ থেকে মুক্ত, বুঝলাম ধারণাটা ভুল। আরো খানিকটা যাবার পর ছোট একটু জায়গাটা দেখলাম, সূক্ষ্ম সাদা বালিতে ঢাকা। তবে যে সেটা সঠিক বালিই তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে এখানে ফাংগাস ছিল না।
ওই গোটা দ্বীপে জঘন্য বীভৎস, আগাছার জঙ্গল, রক্তবীজের রাজত্বের বুক চিরে সাদা সাদা ঐ রকমের বালির পথ চলে গিয়েছে এঁকে বেঁকে। এই জায়গাতে আমরা সব জিনিষপত্র নামালাম। তারপর নৌকোর পালটা খুলে নিয়ে আরও প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিষ-পত্র নামিয়ে নিয়ে, সে সব দিয়ে ছোট একটা তাঁবু তৈরি করলাম। চেহারা-সুরৎ আহামরি কিছু নয় তবে কাজ চলে যাবে। সেখানেই আমার সপ্তাহ চারেক নির্ঝঞ্ঝাটে কাটালাম।
একদিন নজরে পড়লো আমার সঙ্গিনীর ডান হাতে একটা ধূসর রঙের দাগ। আমি আতঙ্কিত হয়ে কার্বলিক অ্যাসিড আর পানি দিয়ে সেটা পরিষ্কার করে দিলাম। পরেরদিন সকালে হাতটা দেখে আঁতকে উঠলাম। দাগটা এখন আঁচিলের মতো হয়ে উঠেছে। হঠাৎ গালের মাঝখানে সোনালী একটা দাগ দেখলাম; কানের কাছে, চুলের নিচে হাত বুলিয়ে বোঝবার চেষ্টা করলাম ওগুলো কী।
দুজনেই বুঝতে পারছিলাম দাগটা কিসের হতে পারে। বুঝে ফেলেই একেবারে মনস্থির করে বসলাম পালাবো।জিনিষপত্র পানীয় জল নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেব। তখনই আমার সঙ্গিনী বললো, “কিন্তু আমরা সংক্রমিত হয়ে পড়েছি!“ বুঝতে পারলাম এই দ্বীপেই আমাদের থাকা উচিৎ।
কখন সখন নানান প্রয়োজনীয় জিনিষের খোঁজে গিয়েছি সেই জাহাজে। সেখানে ফাংগাস একগুয়ের মতো রেড়েই চলেছে। ডেকের একটা ফাংগাস প্রায় আমাদের মাথা ছাড়িয়ে গেছে।
একমাস, দুমাস করে তিন তিনটে মাস কেটে গেলো, এই ফাংগাস আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বীপ ছেড়ে যাবার আশা আমরা ছেড়ে দিলাম, জানি এই অসুখ নিয়ে সুস্থ সমাজে মধ্যে থাকা সম্ভব নয়।
যে রুটির টিনগুলো আমরা ভর্তি ভেবেছিলাম সেগুলো খালি। এছাড়া টুকিটাকি মাংসের টিন, তরিতরকারী ভরসা করার মতো নেই। খাবারের সংগ্রহ ফুরিয়ে আসছে। তাই খাবার কম করে খরচ করবার পরিকল্পনা করলাম।
এই ভেবে ভেবে ক্রমশঃ যখন মরিয়া হয়ে উঠেছি, তখন মনে হলো সমুদ্রে মাছ ধরার কথা। মাছ কিছু পেলেও আমাদের ক্ষিদের তুলনায় তা নিতান্ত্যই সামান্য। এমনি করে চতুর্থ মাসটাও কেটে গেল।
তারপর ভয়ঙ্কর একটা আবিষ্কার করলাম আমরা; বিস্কুট –ওটা আসলে ফাংগাস। হাতে নিতেই ওর মুখে নেমে এলো পাণ্ডুর ছায়া, যেন মৃতের মুখ । ওর মুখে পুরো ঘটনাটা শুনলাম: গতকাল ও নাকি এই ফাংগাস খেয়ে ফেলেছে এবং ওর তা খেতে ভালো লেগেছে।ওকে আমি বারণ করলাম, যত খিদেই পাক তবুও যেন ও ফাংগাস স্পর্শ না করে। প্রতিজ্ঞার করে নিয়ে ও বললো, ওই ফাংগাস খাওয়ার ইচ্ছেটা মনে দমকা হাওয়ার মতো এগোচ্ছিল, অথচ আগে ওগুলো খাবার কোনো ইচ্ছে হয়ই নি।
তারপর আমরা একদিন পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ যেন মনে হলো বালির নিচ থেকে উঠে আসছে বিচিত্র একরকম শব্দ। ঝোপ ঝাড়ে লেগে থাকা ফাংগাসের একটা টুকরো আমার কনুইয়ের কাছে নড়াচড়া করছে। তাকিয়ে মনে হলো ঝাড়টার আকৃতির সঙ্গে কোন বিকৃতদেহ মানুষের মিল রয়েছে। মাথায় চিন্তাটা উঁকি মারবার সাথে সাথে একটা বিশ্রী শব্দ এলো কানে। জিনিষটার মাথা আকারহীন একটা ধূসর বল।
বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা ফাংগাসের ডাল আঁকড়ে ধরলাম। কখন যেন গোগ্রাসে খাওয়ার শুরু করে দিলাম। কিছুতেই আর তৃপ্তি হয় না। হঠাৎ সকালের আবিষ্কারের কথাটা মনে পড়ে গেলো। নিজের উপর রাগ হলো প্রচন্ড। ঘৃণায় ফাংগাসের টুকরোটা ফেলে দিলাম ছুড়ে।
বুঝলাম আমি যা দেখেছি তা ওই সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়ানো জীর্ণ জাহাজের যাত্রীদের কোনো একজনের ভয়াবহ পরিণতি, আর একই পরিণতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
আমাকে দেখে ও বোধহয় বুঝলো কিছু কিছু। আমাকে নীরব সহানুভূতি জানাল। আমি ওকে সব ঘটনা খুলে বললাম। তবে অদ্ভুত-দর্শণ মানবাক্রিতির সেই ফাংগাসটার কথা গোপন করে গেলাম। আতঙ্কের বোঝা একা বয়ে বাড়ালাম বুকে।
এরপর আমরা ঐ জঘণ্য খাদ্য এড়িয়ে চললেও দিনের পর দিন উদ্দাম গতিতে ফাংগাসের পরগাছা দেহটাকে দখল করে ফেললো। ওদের বংশবৃদ্ধিতে বাধা দিতে পারলাম না। সুতরাং দেহ দিনে দিনে ফাংগাসে পরিণত হলো। আমরা বুঝতে পারলাম আর পুরুষ বা নারী হিসেবে আমাদেরকে আর পৃথক করে বোঝা যাচ্ছে না।
আর দিনের পর দিন আমাদের লড়াই একটার পর একটা ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছিল।
এক সপ্তাহ আগে আমরা বিস্কুট খেয়েছি এবং তিনটি মাছ ধরেছি। আজ রাতে মাছ ধরতে এসে আপনাদের নৌকা দেখতে পেলাম। তখন আপনাদের ডেকে আপনাদের দেওয়া খাবার খেলাম।
“মরনাপন্ন দুটো ক্ষুধার্ত দুটো মানুষকে …, দয়া করবার জন্য প্রভু আপনাদের নিশ্চয়ই বঞ্চিত করবেন না।“
সাগরে বৈঠা ডোবানোর শব্দ পাওয়া গেল, সেই সাথে শেষবারের মতো কণ্ঠস্বরটা শোনা গেলো, হালকা কুয়াশা ভেদ করে আসা ভৌতিক বিষণ্ণ কন্ঠ, “বিদায়, চলি তাহলে।“
ভোর হয়ে এসেছে। চাপা আলোয় একটা নৌকা দূরে চলে যেতে দেখলাম। মনে হলো একটা পাতের ভেলা ভাসছে। বৈঠা দুটো পানি ঠেলে চলেছে। বৈঠা সাগরে ডুবলো। নৌকাটা আলোর বৃত্তের বাইরে। আমার দৃষ্টি পড়ল মাথার উপর, স্পঞ্জের বলের মতো। কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে গেল সব।

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *