ইতালিয়া, আলবার্তো মোরাভিয়া

লোকটা অমি রোগাটে আর সহজেই ঘাবড়ে যাই। সরু সরু হাত, লম্বা লম্বা ঠ্যাং আর পেটটাতো এত বসা যে কোমরে প্যান্ট থাকতে চায় না হড় হড় করে নেমে আসে। অর্থাৎ ভাল একটি লরি ড্রাইভারের কোনো গুণই আমার নেই। লরি ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন কি? লরি ড্রাইভাররা সবাই বেশ দশাসই চেহারার লোক হয়-ইয়া চওড়া কাধ, তাগড়াই হাত, পেট আর পিঠ শক্ত-সমর্থ। লরি ড্রাইভারের এই হাত, পিঠ, পেট এই তিনটি জিনিসই চাই। হাত চাই ষ্টীয়ারিং হুইল ঘোরাবার জন্যে, সাধারণত ষ্টীয়ারিং হুইলের বেড় হাতের প্রায় সমান-সমান হয় আর পাহাড়ি রাস্তায় কখনো কখনো পুরো হইলটাই ঘোরাতে হয়। জোরদার পিঠ চাই, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় একভাবে বসে থাকতে হয়। তাই পিঠ ব্যথা করলে বা শক্ত হয়ে গেলে চলে না। এবং শেষমেষ চাই পেট, সীটে সেঁটে বসে থাকতে হবে মাটির বুকে শক্ত পাহাড়ের মত। শারীরিক দিক দিয়ে তো এই ব্যাপার। নৈতিক দিক দিয়ে দেখলে আমার যোগ্যতা আরো কম। লরি ড্রাইভারের কোনরকম স্নায়বিক দুর্বলতা, খামখেয়ালপনা বা ঘরের দিকে পিছুটান থাকলে চলবে না। এককথায় সবরকম সূক্ষ্ম অনুভূতিকে বিসর্জন দিতে হবে । লরি চালানো এত একঘেয়ে আর ক্লান্তিকর কাজ যে আস্ত একটা ষাঁড়ও ঘায়েল হয়ে যাবে। আর নারী সংক্রান্ত ব্যাপারে মোটেই মাথা ঘামানো চলবে না, এ ব্যাপারে তাকে নাবিকদের মত হতে হবে। তা নয়তো ঐ সর্বক্ষণ আসা-যাওয়ার কাজে সে স্রেফ পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু আমার মাথায় নানান চিন্তা ঘুরপাক খায়, মেজাজে আমি মনমরা ও নারী জাতির প্রতি আসক্ত।।
এসব সত্ত্বেও আমি লরি ডাইভারই হতে চাইলাম, আর একটা ট্রান্সপোট কোম্পানীতে চাকরীও জুটিয়ে ফেললাম। আমার সঙ্গী হিসাবে পালোরি নামে মহা চাষাড়ে এক ছোড়াকে দেওয়া হল। ওকেই লরি ড্রাইভার হিসেবে ঠিক ঠিক মানায়। অবিশ্যি তার মানে এই নয় যে লরি ড্রাইভাররা সবাই এক একটি গবেট। কিন্তু ও ছিল একটা আস্ত আকাট আর লরিই ছিল ওর ধ্যানজ্ঞান। বয়েস তিরিশ পেরিয়ে গেলে কি হয়, বুড়োখোকা ছাড়া ওকে কিছু ভাবা যায় না। গাবদা গোবদা গোলগাল মুখ, বসা কপালের নীচে ঘোট্ট দুটি কুতকুতে চোখ, আর মনিব্যাগের মুখের মত এক চিলতে ঠোট। মাঝে মাঝে ঘেত ঘোত করে এক আধটুকু কথা বলা ছাড়া বিশেষ মুখ খোলে না। একমাত্র খাবারের কথা ছাড়া কোন কিছুতেই ওর বিশেষ উৎসাহ দেখা যেত না। একদিনের কথা আমার মনে পড়ছে। নেপলসে যাবার পথে ইতরির এক সরাইখানায় ঢুকেছি। ক্লান্ত লাগছিল, খিদেও পেয়েছিল বেজায়। খাদ্যবস্তু বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না। দেখলাম বীন আর শূয়োরের শুকনো মাংস দিয়ে রান্না করা হয়েছে–এসব আমার চলে না। পালোমবি কিন্তু দুপ্লেট সাবড়ে দিল, তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে সামনের দিকে চেয়ে রইলো। ভাবখানা যেন গভীর কিছু ভাবছে। ‘আরো চার প্লেট ওড়াতে পারি,‘ ওর গভীর বক্তব্যটি পেশ করল। এই কথাটা বলতে ওর এতক্ষণ লাগছিল।
এহেন লোক, যে কিনা কাঠ কিংবা পাথর দিয়ে তৈরী হলেই মানাতে ভালো, সেই হলো আমার সর্বক্ষণের সাথী। তাই ইতালিয়ার দেখা পেয়ে যেন বেঁচে গেলাম। সে সময়টাতে আমরা রোম-নেপলস সড়কে যাতায়াত করছি, আর নিয়ে যাই প্রায় সবরকমই জিনিসই। ইট, লোহা, নিউজপ্রিন্ট কাঠ, ফল, এমন কি কখনো-সখনো মেয়ের দলও চালান দি। ইতালিয়ার সঙ্গে আমাদের দেখা হয় তেসিনায়। হাত দেখিয়ে লরি থামিয়ে ওকে রোমে পৌছে দিতে অনুরোধ জানাল ও। সচরাচর এরকম অনুরোধ আমরা রাখিনা ওপর থেকে বারণ আছে। কিন্তু ইতালিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে বুজলাম এ নিয়ম এখানে খাটবে না। ওকে তুলে নিলাম। লাফিয়ে লরিতে উঠতে উঠতে ও বলল: ‘বরাবর দেখছি, লরি ড্রাইভাররা ভারী লক্ষ্মী ছেলে হয়।‘
ইতালিয়ার চেহারায় চটক আছে, একথা মানতেই হবে। লিকলিকে সরু কোমরের উপর টাইট জাম্পারের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে উদ্ধত বুক। দেখলেই কামড় মারে। লম্বা গলা। ছোট্ট মাথায় বাদামী চুল। একজোড়া সবুজ চোখ। দীর্ঘ শরীরের তুলনায় পা দুটো একটু বাকা, হাঁটু বঁকিয়ে হাঁটছে মনে হয়। ঠিক সুন্দরী না হলেও এমন কিছু ছিল ওর যা মন টানে? প্রমাণ মিলল হাতে-নাতে। তখন আমরা সিসতারনার কাছাকাছি এসে গেছি। পালোমবি লরি চালাচ্ছে। ইতালিয়া ওর হাত আমার হাতে চালান করে দিল, নিবিড় চাপে টের পেলাম। জেলেত্রি পৌছনো পর্যন্ত এভাবে চলল। ওখানে পালোমবির কাজ ফুরোলো-আমি ড্রাইভারের সীটে গিয়ে বসলাম। গরমের দিন। বিকেল চারটে-টারটে হবে। সবচেয়ে গরম এ সময়টায়। ঘামে আমাদের হাত পিছলে-পিছলে যাচ্ছিল। থেকে থেকে ওর সবুজ মায়াবী চোখ মেলে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। মনে হল, এতদিন জীবনটা তো অ্যাসফল্টের একটা একঘেয়ে সড়ক ছাড়া কিছু ছিল না, এবার বোধহয় জীবনে আলো আর হাসি ফুটবে। একটি নারী বোধহয় জীবনে এল। সিসতারনা থেকে ভেলেত্রি যাবার পথে পালোমবি নামল গাড়ির চাকাটা দেখতে। এই সুযোগ ছাড়লাম না
-ইতালিয়াকে একটা চুমু খেলাম। ভেলেত্রিতে এসে খোশমেজাজেই পালোমবির সঙ্গে জায়গা বদল করলাম। আপাতত একটু হাতে চাপ, ছোট্ট একটা চুমুই যথেষ্ট।
এরপর থেকে ফি হপ্তায় একবার কি দূর ইতালিয়া নিয়মিত ওকে রোম থেকে তেরাসিনা আর তেরাসিনা থেকে রোমে নিতে যেতে বলতো আমাদের। আমরাও নিয়ে যেতাম। সকালের দিকে ও দেয়াল ঘেসে দাঁড়িয়ে থাকত। হাতে সব সময়ই সুটকেশ বা ঐ জাতীয় কিছু থাকত। আর পালোমবি গাড়ি চালাচ্ছে দেখলে ইতালিয়া সারাটা রাস্তা আমার হাত ছাড়ত না। নেপলস থেকে ফিরে আসার পথে তেরাসিনায় অপেক্ষা করতে ও। গাড়িতে উঠেই হাত জড়িয়ে ধরতো। এমন কি ওর অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওকে চুমু খেতাম-অবিশ্যি পালোমবিকে লুকিয়ে ! সোজা কথা আমি তখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। স্ত্রীলোকের সংস্পর্শ পেয়েছি বহুদিন পর। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে ইতালিয়া একটু মুখভার করে তাকালেই বুকটা মুচড়ে ওঠে, বাচ্চা ছেলের মতো চোখে জল এসে পড়ে। জানি পুরুষমানুষের এরকম চোখের জল ফেলা মানায় না, কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারিনা যে। গাড়ি চালাতে চালাতে নীচু গলায় বাক্যালাপ চালাতাম আর পালোম্বি ব্যাটা পড়ে পড়ে ঘুমোত। কি অত কথা বলতাম কে জানে। নিছক প্রেমালাপে যেমন হয় তেমনি কতো অর্থহীন কথা হয়তো বলে গেছি। তবে এটুকু মনে আছে, সময় কখন কেটে যেত -যে পথ আগে কখনো ফুরবে না বলে মনে হত তা যেন কখন ছোট্ট হয়ে গেল জাদুবলে। গাড়ীয় স্পীড কমিয়ে দিতাম। এমন কি গরুর গাড়িও বেরিয়ে যেত পাশ দিয়ে। জায়গায় পৌঁছতাম অবশ্য সময়মতই। ইতালিয়া নেমে পড়ত। রাত্তিরে খুব মজা হত। লরি যেন আপসে চলতে আমার এক হাত থাকতে স্টীয়ারিংয়ে আরেক হাত ইতালিয়ার কোমর জড়িয়ে। দূরে অন্য গাড়ির আলো সংকেত জানিয়ে যখন নিভত জলতত, মনে হত আমিও আমার গাড়ির আলো এমনভাবে নেভাই জ্বালাই যাতে ওরা বোঝে আমার মন খুশীতে ভরপুর। যেন এই কথা ওরা ওই সংকেতে দেখতে পায় : “আমি ইতালিয়াকে ভালোবাসি, ইতালিয়া ভালোবাসে আমাকে।“
পালোমবিকে দেখে মনে হত, হয় ও কিছুই দেখেনি, নয়তো না দেখার ভান করে আছে। ইতালিয়া যে এত ঘন ঘন যাতায়াত শুরু করেছিল সেজন্যে এতটুকু আপত্তি কখনো সে করেনি। ইতালিয়া যখন গাড়িতে উঠত ও তখন তাকে ঘোঁত-ঘোঁত করে সম্ভাষণ জানবার মত করে বসবার জায়গা করে দিত। ইতালিয়া সবসময় মাঝখানে বসত। কারণ অন্য গাড়ি ওভারটেক করতে গেলে পালোমবিকে দেখতে হত রাস্তা ঠিক আছে কিনা। এমন কি ইতালিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন একটা কথা যখন উইন্ডন্ক্রীনের কাঁচের উপর লিখলাম তখনো পালোমবি মুখ খুললো না। অনেক ভেবেচিন্তে শাদা হরফে লিখলাম: ‘ইতালিয়া দীর্ঘজীবী হোক। কিন্তু পালোমবিটা এমন হাঁদা, কথাটার যে দুটো মানে হয় তা টের পেল না। অন্য লরি ড্রাইভাররা ঠাট্টা করে বলতে লাগল হঠাৎ আমরা এত দেশভক্ত হয়ে উঠলাম কেন। একমাত্র তখনই হাঁদারামের হাঁ-করা মুখে ধীরে ধীরে হাসির দেখা দিল। বলল: ‘ওরা ভাবে ইতালিদেশের কথা লিখেছে, আসলে তো মেয়েটা … … মাথায় বুদ্ধি আছে তোমার।‘
এভাবে মাস দুয়েক কি তারও বেশী গড়িয়ে গেল। এরপর একদিন আমরা ইতালিয়াকে যথারীতি তেরাসিনায় নামিয়ে নেপলসে পৌছে দেখি জিনিসপত্র খালাস করে তখুনি আমাদের রোমে ফেরবার তলব পড়েছে। নেপলসে রাত কাটাবার দরকার নেই। মেজাজটা বিগড়ে গেল। কেননা পরদিন সকালে ইতালিয়ার সঙ্গে দেখা হবার কথা। কিন্তু কি করা যাবে হুকুম তো মানতেই হবে। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। স্টীয়ারিং ধরে বসলাম আর পালোমবি পড়ে পড়ে নাক ডাকাতে লাগল। ইতরি পর্যন্ত ঠিকই চলল সব কিছু-বহু বাঁক এ-রাস্তাটায়। আর রাত্তিরে লরি ড্রাইভারের শরীর যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে তখন রাস্তার বাঁকই তাকে সজাগ রাখে, প্রকৃত বন্ধুর কাজ করে। কিন্তু ইতরি পেরিয়ে ফলদি-র কমলা-বাগিচার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমার দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে এল, জেগে থাকার জন্য তখন ইতালিয়ার কথা ভাবতে শুরু করলাম। ভাবতে ভাবতে দেখলাম ইতালিয়ার চিন্তা বনের শাখা-প্রশাখার মত জট পাকাতে পাকাতে এক জমাট অন্ধকারে গিয়ে শেষ হয়েছে। হঠাৎ নিজের মনে বলে উঠেছিলাম মনে আছে: ‘ভাগ্যিস ইতালিয়ার কথা ভাবছিলাম তাই জেগে আছি, নয়তো কখন ঘুমিয়ে পড়তাম।‘ বলা বাহুল্য আমি ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আর চিন্তাটা এসেছিল ঘুমের মধ্যে। এতে ঘুম আরো জেঁকে এল। প্রায় এমন সময়েই টের পেলাম লরিটা রাস্তা ছেড়ে একটা গাডডায় পড়ে যাচ্ছে। পেছনের ট্রেলারটা উল্টে গিয়ে প্রচণ্ড ঝাকুনির সঙ্গে আওয়াজ কানে এল। লরিটা আস্তে আস্তে যাচ্ছিল বলে রক্ষে, তাই আমরা চোট পাইনি। কোনমতে বেরিয়ে এসে দেখি ট্রেলারটা একদম উলটে গেছে, চাকা শূন্যে, আর রং-করা চামড়ার বোঝা গাডডায় পড়ে আছে। চারদিক অন্ধকার, চাঁদ নেই, তারাভরা আকাশ। দৈবাৎ আমরা তেরাসিনার কাছাকাছি এসে পড়েছিলাম। ডানদিকে খাড়া পাহাড় আর বাঁ দিকে আঙুর বাগান ছাড়িয়ে নিস্তরঙ্গ কালো সমুদ্র।
পালোমবি শুধু বলল: ‘কাণ্ডটা করে ছাড়লে যা থোক।‘ তারপর জানাল তেরাসিনা থেকে আমাদের সাহায্য চাইতে হবে। আর তক্ষুণি হেঁটেই রওনা লাগাল। রাস্তা বেশী দূরে নয়, কাছেই তেরাসিনার কাছাকাছি আসতেই পালোমবির খাই-খাই ভাব যথারীতি জেগে উঠল। বলল, ব্রেকডাউন ক্রেন আসতে বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে, তাই ততক্ষণে আমরা একটা সরাইখানায় ঢুকে কিছু খেয়ে নিতে পারি। শহরে পৌছে একটা সরাইখানার খোঁজে লেগে গেলাম। কিন্তু ঐ সারা-রাত্তিরে একটি মাত্র কাফে ছাড়া আর সব দরজায় তখন ঝাপ পড়ে গেছে। কাফেটাও বন্ধ হব-হব করছে। সমুদ্রমুখী ছোট একটা রাস্তা ধরে কিছুদূর হঁটতেই একটা আলো আর সাইনবোর্ড লাগানো দরজা নজরে পড়ল। মন আমাদের আশায় দুলে উঠলো। পা চালিয়ে এগিয়ে দেখি একটা সরাইখানাই বটে। তবে দেখলাম খড়খড়ি নেমে যাচ্ছে, দোকান বন্ধ হবার মুখে। কাঁচের দরজায় খড়খড়ি পড়লেও ফাঁক দিয়ে দেখা যায়। ‘বোঝাই যাচ্ছে বন্ধ হয়ে গেছে’, বলতে বলতে পালোমূবি ভেতরে উকি মারল। আমিও ঝুঁকে পড়লাম। অনেকটা গ্রাম্য সরাইখানার মত বড়সড় একটা ঘরে একটা কাউন্টার আর কিছু টেবিল রয়েছে দেখলাম। চেয়ারগুলো সব টেবিলের উপর উল্টে রাখা। মাঝখানে বিরাজমানা ইতালিয়া স্বয়ং-ঝাঁটা হাতে ঘর পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। ঘরের এক ধারে কাউন্টারের পেছনে একটা কুঁজোলোক দাঁড়িয়ে আছে। কুঁজো এর আগেও দেখেছি, কিন্তু এমন নিখুত কুঁজো এর আগে দেখিনি। হাত দুটোর মাঝখানে বসানো মুখ আর পিঠের কুঁজ ছাড়িয়ে গেছে মাথাকে। ইতালিয়ার দিকে ও বিষ চোখে চেয়েছিল। চঞ্চল ভঙ্গিতে ইতালিয়া ঘরের মেঝে সাফ করছিল। কুঁজোটা না নড়েই কি যেন বলল, ইতালিয়া ঝাঁটা কাউন্টারের গায়ে হেলান দিয়ে রেখে গলা জড়িয়ে ধরে ওকে নিবিড়ভাবে চুমু খেল। ফের ঝাঁটা নিয়ে ও ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করল। দেখে মনে হল যেন নাচছে ইতালিয়া। কুঁজোটা কাউন্টার থেকে নেমে ঘরের মাঝখানে এল। ভালভাবে দেখে বুঝলাম ও জাহাজী লোক। পায়ে স্যাণ্ডাল, পরনে নীলরঙা ছেলেদের ট্রাউজার আর বুকখোলা শার্ট। লোকটা দরজার কাছে আসতেই আমরা সরে দাঁড়ালাম। ও কাঁচের দরজাটা খুলে ভেতর থেকে খড়খড়ি ফেলে দিল।
‘এ যে দেখেও বিশ্বাস হয় না,‘ আমি বললাম । মনের চাঞ্চল্য চাপতে হবে তো। পালোমবি শুনে বলল: ‘তাই বটে।‘ ওর বলার ধরনে যে তিক্ততা ফুটে উঠল তাতে অবাক হলাম। গ্যারেজে গিয়ে লরিটাকে খাড়া করে ছড়িয়ে পড়া চামড়া ফের তুলে ওঠাতে ওঠাতে বাকি রাতটা কেটে গেল। ভোরবেলা রোমের রাস্তায় পাড়ি জমাতে পালোমবি মুখ খুলল। আমি অন্তত যদ্দিন ওকে জানি এই প্রথম ওকে যাকে বলে কথা বলা তাই বলতে শুনলাম। ‘দেখলে কাণ্ডটা‘ ও বললো, ‘কুত্তী মাগীটা কী ক্ষতিটাই করলে আমার ?‘
‘তার মানে?‘ আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
‘কতো কথাই না ও আমায় বলেছে।‘ টেনে টেনে ওর একঘেয়ে ধরনে পালোমবি বলে চলল: ‘তাছাড়া যাতায়াতের সময়ে সবসময়ই তো ওর হাত আমার হাতে ধরা থাকত। আমি ওকে বিয়ে করব বলেছিলাম–ও আমার একরকম বাগদত্তা ছিল বলতে গেলে। শেষকালে কিনা একটা কুঁজোকে-‘
পালোমবির কথা শুনে তো আমার চক্ষুস্থির। চুপ করে রইলাম। পালোমবি বলে চলল: কতো সুন্দর সুন্দর উপহারই না দিয়েছি-প্রবালের একটা নেকলেস, সিল্কের স্কার্ফ, পাতলা চামড়ার এক জোড়া জুতো … মাইরি বলছি, ওকে আমার দারুণ ভালো লাগত। তাছাড়া আমার সঙ্গে ওকে খাসা মানাত। মাগীটা এমন হারামি কে জানত…’
আপন মনে পালোমবি গজগজ করে চলল। ভোর তখন সবে ফুটছে আর আমাদের লরি ছুটছে রোমের দিকে। বুঝতে বাকি রইল না ইতালিয়া আমাদের দুজনকেই ঠকিয়েছে। আর এই করে রেলের টিকিটের পয়সা সে বাঁচিয়েছে। যা আমারই মনের কথা সেই কথা পালোমবির মুখে শুনতে খুব খারাপ লাগছিল। তাছাড়া যার মুখে কথাই যোগাত না তার মুখে এত কথা কেমন বেমানান ঠেকছিল। শেষকালে আর থাকতে না পেরে বললাম: ‘দয়া করে থামো এবার। ঐতো হাড়গিলে চেহারা, ওর কথায় অত দরকার কিসের? ‘ঘুমুতে দাও।‘ বেচারা পালোমবি জবাবে বলল: ‘তা থামছি। কিন্তু মন মানে কই। এরপর সারা রাস্তা ও আর মুখ খোলেনি।
এ ঘটনার দীর্ঘদিন পরেও পালোমবি মনমরা হয়ে রইল। আমার জীবন ফিরে এল আগের জীবনে আবার সেই রাস্তা যে রাস্তা আর ফুরোতে চায়না, দিনে যা দুবার পারাপার করছি। একদিন দেখলাম ঠিক নেপলস রোডের ওপরই ইতাইয়া এক মদের দোকান খুলে বসেছে। সেইদিনই লরি চালানো ছেড়ে দিলাম। দোকানের নাম দিয়েছে “লরি ড্রাইভারের পান্থপাদপ।‘ পান্থপাদপ বই কি! বলা বাহুল্য আমরা কোনদিনই ঐ পান্থপাদপের তলায় আশ্রয় নিইনি। তবে যখন চোখে পড়ত কাউন্টারের পেছনে দাড়িয়ে আছে ইতালিয়া, আর কুঁজোটা ওর হাতে মদের বোতল আর গেলাস তুলে দিচ্ছে একে একে তখন বুকটা টনটন করে উঠত। নিজেকে সরিয়ে নিলাম আমি। ‘ইতালিয়া দীর্ঘজীবী হোক‘ লেখা লরিটা অবিশ্যি এখনো চলে ও পথে-চালায় পালোমবি।

কমল গুপ্ত

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *