গ্রাম্য ডাক্তার, ফ্রানৎস কাফকা

পরিস্থিতি বড় জটিল; এখনি রওনা হওয়া দরকার; ভীষন খারাপ অবস্থা নিয়ে একজন রোগী আমার আশায় বসে আছে মাইল দশেক দূরের এক গ্রামে; এদিকে ওর আর আমার মাঝের এই ফাঁকা জায়গাটুকু আজ তুষার ঝড়ের বরফে ইয়া মোটা আস্তরনে ঢাকা পড়ে আছে; আমার একটা এক্কা আছে, বড় বড় দুটো চাকাওয়ালা হালকা পাতলা, আমাদের গ্রাম্য পথে চলাচলের জন্য এক্কেবারে লাগসই; আগাগোড়া পশম পোশাকে ঢেকে, আমার যন্ত্রপাতির বাক্সটা হাতে, আমি উঠোনে নেমে এসেছি যাত্রার জন্য একেবারে প্রস্তুত; তবে কোনো ঘোড়ার ব্যবস্থা নেই, মানে ঘোড়া নেই। আমার নিজের ঘোড়াটা মরে গেছে রাতে, এই বরফ শীতল শীতের পরিশ্রমে বেহাল হয়ে পড়েছিল; আমার চাকর মেয়েটা এখন গ্রামে চক্কর মেরে বেড়াচ্ছে একটা ঘোড়া ব্যবস্থা করবার ধান্দায়; জানি, পন্ডশ্রম, তবু দাঁড়িয়ে আছি একাকী, পরতে পরতে তুষার আমার শরীরে পড়ে পড়ে আরো পুরু হয়ে উঠছে, ক্রমে ক্রমে বের হওয়াটাও আরো অসম্ভব হয়ে উঠছে। দোরপথে দেখা গেল মেয়েটা আসছে, শূণ্যহস্ত, হাতের লন্ঠনটা দোলাচ্ছে; তাইতো, এই অসময়ে কে-ইবা তোমাকে তার ঘোড়াটা দেবে এমন এক কাজে? লম্বা লম্বা দৃঢ় পদক্ষেপে আমি আরো একবার উঠোন পেরোলাম; আর কোনো উপায় দেখছি না; আমার সেই চরম বিভ্রান্তিকর অবস্থায় কষিয়ে এক লাত্থি ঝাড়লাম আমাদের বছরকেবছর ধরে শূণ্য পড়ে থাকা শূকরের খোয়াড়ের জরাজীর্ণ দরজায়। দরজাটা ধাই করে হাট হয়ে খুলে কব্জায় বেঁধে এদিক ওদিক ঝটপট শুরু করে দিল। ঘোড়া ঘোড়া ভাবসা একটা গন্ধ ভেসে আমছে ভেতর থেকে। ভেতরে দড়িতে ঝোলানো একটা ক্ষিণ আলোর দৃঢ় লন্ঠন দুলছে। একটা মানুষ, অনতিউচ্চ সেই জায়গাটার মধ্যে পাছা ঘসে ঘসে বেরিয়ে আসছে, দেখা গেল নীলছে মনির চোখওয়ালা একটা চেহারা। “আজ্ঞে হুজুর, কিছু লাগবে?“ জানতে চাইলো লোকটা, চার হাত পায়ের উপর ভর করে হামাগুড়ি দিতে দিতে বেরিয়ে এলো। বুঝতে পারছিনা কী বলা দরকার বরং কেবল ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলাম খোঁয়াড়ে আরও কী না কী আছে। চাকর মেয়েটা আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। “আপনার নিজের বাড়ির ভেতরে আপনি আরো কী না কী খুঁজে পাবেন কে জানে,“ কথাটা বললো মেয়েটা, দুজনেই হেসে উঠলাম। সহিসটা বলে উঠলো, “এই যে, ভাই, ও, বোন!“ এবার দুটো ঘোড়া, শক্তিশালী পাঁজরওয়ালা পেল্লায় দুটো জন্তু, একটার পর একটা, পাগুলো ভাঁজ করে নিয়ে, দুজনেই নিজেদের জুত সই মাথা দুটো উটের মতো ঝুঁকিয়ে, নিছক পাছার ওপর ভর করে কোনো রকমে ঠেসে ঠুসে পুরো দরজার ফাঁকটুকু কাজে লাগিয়ে বেরিয়ে এলো। তবে যেই না ওরা বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো, মনে হলো ওগুলোর লম্বা লম্বা পা আর শরীরটা যেন আঁকা ছবি। “ওর সাথে একটু কাজে হাত লাগাও,“ বললাম, অধীর আগ্রহে মেয়েটা এক দৌড়ে চলে গেল ঘোড়ার সাজ পরানোর কাজে সেই সহিসটাকে সহযোগিতা করবার জন্য। তখনোও সে ওর কাছে পুরো পুরি পৌছুতেই পারেনি ব্যাটা ওকে একেবারে জাপটে ধরে মুখের সাথে নিজের মুখটা ঠেসে ধরলো। মেয়েটা চিৎকার করে উঠে দৌড়ে ফিরে চলে আসে আমার কাছে; ওর এক গালে জ্বল জ্বল করে ফুঁটে উঠেছে দু সারি দাতের লাল দাগ। “বর্বর, জানোয়ার“ রাগে চেচিয়ে উঠলাম, “চাপড়ে একেবারে লাল করে দেবো।“ তবে ঠিক তখনি আমার মনে পড়ে গেল লোকটা আমার অপরিচিত, জানি না ও কোত-থেকে এসেছে, আর সবাই যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখন এই লোকটাই নিজ ইচ্ছায় আমাকে সাহয্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। লোকটা যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই আমার ধমকটা গায়ে মাখলো না, একবার শুধু আমার দিকে তাকিয়ে নিয়ে আবার ঘোড়াগুলোকে নিয়েই ব্যস্ত পড়লো একটু পরেই সব কিছু একেবারে ঠিকঠাক করে দিয়ে বললো, “উঠে পড়ুন।“ দেখলাম, দুর্দান্ত এক জোড়া ঘোড়া, আমি সারা জীবনেও এমন ঘোড়ায় উঠিনি, খুশি খুশি উঠে বসলাম। বললাম, “চালাবো আমিই, তুমিতো রাস্তা চেনো না,“ ও বললো, “তা আমিতো যাচ্ছি না আপনার সাথে, আমি রোজের সাথে থাকবো।“ “অসম্ভব,“ তার-স্বরে চিৎকার করে ওঠে রোজ, ভাগ্যের অনিবার্য পরিনতির পূর্ব লক্ষণ ঠিকঠাক আঁচ করতে পেয়ে মেয়েটা পালিয়ে গেল ঘরের মধ্যে; সে দরজায় ছিকল তুলে দিলো, তার ঝনঝন শব্দ ভেসে এলো আমার কানে; শুনতে পেলাম চাবি ঘুরিয়ে তালা বন্ধ করবার শব্দ; আরো দেখতে পেলাম, ঢোকবার ঘরের আলোটা সে কী ভাবে নেভালো তারপর অতি দ্রুত এক এক করে সব কটা কামরার আলো নিভিয়ে নিজেকে লোক চক্ষুর আড়ালে রাখার ব্যবস্থা করে ফেললো। “তুমি আমার সাথে আসছো,“ সহিসকে বললাম, “ নইলে আমিও যাচ্ছি না, যাওয়াটা যদিও খুব জরুরী। তবে কিন্তু মূল্য হিসাবে মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিয়ে যাবার কথা আদৌ ভাবছি না।“ লোকটা দুই হাতে তালি দিয়ে বলে উঠলো, “হেট-হেট-হুর;“ নদীর জোয়ারে খড়-কুটো ভেসে যাওয়ার মতো উড়ে চললো আমার এক্কাগাড়িটা; আমি শুধু শুনতে পেলাম যে, ঐ সাহস ব্যাটার থাবায় আমার বাড়ির দরজাটা চড়চড়-মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়ছে; তখন সেই এক্কার ঝোড়ো গতিতে আমার কানে তালা ধরে গেছে, চোখে অন্ধকার দেখছি, আর ধিরে ধিরে সেই অবস্থা গ্রাস করে ফেলছে আমার গোটা অনুভূতি। তবে নিছকই মুহূর্তখানেক, যেন আমার উঠোনের দরজার ঠিক বাইরেই আমার রোগীর খামার বাড়ি হাট করে খোলা, আমি এরমধ্যেই পৌছে গেছি, ঘোড়াগুলোও একেবারে স্থবীর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে; তুষার ঝড় থেমে গিয়েছে; চারিদিকে জ্যোত্স্নার আলো; আমার রোগীর বাপ-মা তাড়া হুড়ো করে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে, পেছনে পেছনে রোগীর বোন; আমাকে প্রায় তুলে বের করে আনা হলো এক্কা থেকে; তাদের কথার পিঠে কথার বিভ্রান্তিকর জটলায় আমি এক বর্ণও বুঝে উঠতে পারলাম না; রোগীর ঘরটা একেবারে দমবন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা; চুলোটার দিকে কারো খেয়াল নেই অনর্থক ধোয়া বেরোচ্ছে; মনে হলো জানালাটা ধাক্কা মেরে খুলেদি; তবে এখন আমার প্রথম কাজ রোগীটাকে দেখা। কংকালসার দেহ, জ্বর-জাড়ি নেই, ঠান্ডা লাগেনি, শরীরের তাপমাত্রা স্বভাবিক, শূণ্য দৃষ্টি, আদুল গায়ে যুবকটি পালকের বিছানা থেকে উঠে, আমার গলাটা দু হাতে জাপটে ধরে কানে ফিস ফিস করে বললো: “ডাক্তারবাবু, যাই মরে যাই।“ ঘরটার চারিদিকে তাকালাম; কথাটা আর কেউ শুনতে পায়নি; ওর বাপ-মা অধির আগ্রহ নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আমার রায় শোনবার জন্য; বোনটা একটা চেয়ার নিয়ে এসেছে আমার হাতের বাক্সটা রাখবার জন্য; বাক্সটা খুলে আমার যন্ত্রপাতিগুলো হাতড়াতে লাগলাম; ছেলেটা ওর বিছানায় বসে বসেই ক্রমাগত ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছে ওর আবেদনের কথাটা; আমি ঝট করে একটা চিমটি তুলে নিয়ে মোমবাতীর আলোতে ভালো ভাবে পরিক্ষা করে নিলাম, আবার রেখে দিলাম বাক্সে। “আসলেইতো,“ এক্কেবারে নাস্তিকের মত চিন্তা, “এ ধরনের ব্যাপারে দেবতারাই কাজে লাগে ভালো, হারানো ঘোড়া পাঠিয়ে দেয়, তার সাথে বাড়তি আরো একটা জুড়ে দিল তাড়া দেখে, তারপরেও আবার মুকুটের পালকের মতো যোগ করে দিল একজন সহিস –“ এই মাত্র আবার মনে পড়ে গেলো রোজের কথা; কী-ইবা আমার করবারছিল, কীভাবেইবা আমি বাঁচাবো ওকে, ঐ সহিস ব্যাপার নাগাল থেকে আমি কী পারি ওকে হিড় হিড় করে টেনে বের করে নিয়ে আসতে এই দশ মাইল দূরে বসে, ওর সাথে আবার এক দল ঘোড়া, সেগুলো আমার আদেশও মানে না । ঘোড়া দুটো, এবার, লাগাম ঢিলে করে পিছলে বেরিয়ে এসে, বাইরে থেকে ঠেলা মেরে জানালাগুলো খুলে ফেলেছে, কী জানি কীভাবে; দুজনেই একেকটা জানালার মধ্যে মাথা গলিয়ে দিয়ে, পরিবারের লোকজনের হতচকিত কান্নাকাটি দেখে একেবারে নির্বিকার, ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে রোগীর দিকে। “বেশ বেশ হয়েছে, এখন ফিরে চলো,“ মনে হলো, যেন ঘোড়াগুলো ফিরে যাওয়ার জন্য তাড়া দিতে এসেছে আমাকে, তবুও রোগীর বোনের কাছে আমার পশমের পোষাকটা খুলে দিতে রাজি হলাম, ও ভাবছিল আমি গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। এক গ্লাস রাম ঢেলে নিয়ে, বুড়ো মানুষটা আমার কাঁধে চাপড় মারলেন, ওনার এই আথিতেয়তার ঘনিষ্টপনার মধ্যে টের পাওয়া যায় তাঁর বড়লোকি ঠাট; মাথা নাড়লাম; বৃদ্ধ লোকটার চিন্তার সংকীর্ণতা আমাকে অসুস্থ করে তুলেছে; পানীয়টা ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনে এটাই আমার একমাত্র কারণ। রোগীর মা দাঁড়িয়েছিলেন পাশেই এবার সে মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে শুনিয়ে বললেন ওটা নিতে; আমি নিলাম, এবার একটা ঘোড়া ছাদের দিকে মাথা তুলে তুমুল জোরে ডাক ছেড়ে উঠলো, রোগীর বুকে কান লাগিয়ে শুনছি, আমার ভিজে দাড়ির নিচে বুকটা ওর দুরু দুরু কাঁপছে। আমার ধারনাই ঠিক,; ছেলেটা একেবারেই সুস্থ, ওর রক্তের সঞ্চালনে টুক-টাক সামান্য কিছু একটা গন্ডোগোল দেখা দিয়েছিল মনে হয়, ওর মায়ের যা বলে-কয়ে খাওয়ানোর অভ্যাস, বেশী কফি খেয়ে ফেলার কারনেও এমনটা হতে পারে, তবে এক ধাক্কায় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেই ছেলেটা একেবারে সুস্থ স্বভাবিক। আমিতো আর দুনিয়াটা সুধরাবার ঠিকা নিয়ে বসে নেই তাই ওকে শয়েই থাকতে দিলাম। আমি এ জেলার সরকারী ডাক্তার, প্রাণপন খাঁটা-খাঁটুনি করে আমি আমার দায়িত্ব পালন করে আসছি, কখনো সখনোতো একেবারে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। পারিশ্রমিকের অবস্থা ভীষণ বাজে তবুও গরীবের জন্য সদা মহৎ ও অনুগ্রাহী। এখনো আমার দেখা বাকি রয়ে গেলো যে রোজ ঠিক-ঠাক আছে, আর এই অসুস্থ ছেলেটা নিজের পথ খুঁজে পেয়েছে তারপর আমিও মরে যেতে চাই। এই অসীম অনিঃশেষ শীতে কী করছিলাম আমি ওখানে! আমার ঘোড়া গেলো মরে, গোটা গ্রামের কোনো মানুষ অন্য একটা ঘোড়া ধার দিতে রাজি হলো না। আমার শোরের খোয়াড় থেকেই বেরিয়ে এলো গাড়ি-টানবার মত পশু; কোনো ভাবে যদি ওগুলো ঘোড়া না হয়ে অন্য কিছু হলে তাহলে এখানে আমার শূয়োরের পিঠে চেপে আসতে হলেও তাই আসতে হতো। এটাই খাঁটি কথা। এসে এই পরিবারের সাথে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছি। ওরাতো এসবের কিছুই জানে না, আর জানলে বা কী, ওরা বিশ্বাস করতো। প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়া বেশ সহজ, মানুষের সাথে বোঝাপড়া করে চলা খুবই কঠিন। বেশ, তাহলে এখন বলা যায়, এখানেই এই রোগী দেখার কাজ শেষ, আরো একবার আমাকে অনর্থক ডেকে নিয়ে আসা হলো, এ রকম হরহামেশাই হচ্ছে আমার সাথে, রাতে আমার ঘরের ঘন্টা বাজিয়ে বাজিয়ে গোটা জেলার লোকজন আমার জীবনটা একেবারে নরক বানিয়ে তুলেছে, তবে তাই বলে এবার বলীর পাঠা বানাতে হলো রোজকে, বেচারা চমৎকার মেয়েটা আমার বাড়িতে আছে আজ প্রায় বছরকয়েক, একবারের জন্যেও চোখ তুলে ওকে ভালো করে খেয়ালও করা হয়নি –ওর এই ত্যাগের কথা বলে বোঝানো যাবে না, যেমন করে হোক আমাকেই মাথায় মাথায়ে এর পেছনে একটা মজবুত যুক্তি তৈরি করে নিতে হবে, নইলে এই পরিবারটাকে আমার শত্রু বলে মনে হবে, তবুওতো সব চাইতে বেশী কুশল মঙ্গল কামনা করেও কি এরা রোজকে আর আগের মতো ফিরিয়ে দিতে পারবে আমার কাছে।আমার বাক্সটা বন্ধ করে ফার-কোটটার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, এদিকে পরিবারের কজন একসাথে দাঁড়িয়ে, বাবা লোকটা হাতে রামের গ্লাসটা নিয়ে নাকে শুকছিলেন, মা, বোঝাই যাচ্ছে আমার ওপর সন্তুষ্ট নন –কেন, মানুষ যে কী আশা করে? –নিজের ঠোট কামড়াচ্ছে চোখে অশ্রু, বোনটা একটা রক্তে ভেজা তয়েলিয়া নেড়ে দেখাচ্ছে, আমিও এতসব দেখেশুনে মোটামুটি শর্তস্বাপেক্ষে স্বীকার করতে প্রস্তুত হয়ে পড়লাম যে ছেলেটা আদতে অসুস্থ হলেও হতে পারে। ওর দিকে গেলাম, আমাকে দেখে ছেলেটা আমন্ত্রন জানিয়ে এমন ভাবে এক চিলতে হাসি হাসলো যেন ওর জন্য আমি এক বাটি ফেলে দেওয়া পুষ্টিকর মাংসের ঝোল নিয়ে এসেছি, –আহ্, এবার দুটো ঘোড়াই এক সাথে চি-হি-হি করে উঠলো; শব্দটা, আমার মনে হলো, এই রোগীটাকে পরিক্ষা করে দেখবার জন্যই স্বর্গ থেকে আমায় নিযুক্ত করা হয়েছে – আর এবার আমি খুঁজে পেতে খেখলাম যে ছেলেটা আসলেই অসুস্থ। ওর ডান দিকে, নিতম্বের কাছাকাছি, আমার হাতের তালুর মতো বড় একটা ঘা। গোলাপ-রাঙ্গা, অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন সেডের রং, যত গভীর তত গাঢ়, ধারটা হালকা লালাভো, হালকা গুটি গুটি দানাদান, ছড়িয়ে ছিটিয়ে কনা কনা জমাট বাঁধা রক্ত, যেন দিবালোকে উন্মুক্ত খনি-মুখ। দূর থেকে এমনই দেখায়। তবে একেবারে কাছ থেকে দেখলে আরো জটিলতা ধরা পড়ে। অবাক বিস্ময়ে আলতো একটা উহ্ শব্দ বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। পোকা, আমার কেনে আঙ্গুলের মতই লম্বা এবং পুরু, ও গুলোই গোলাপের মত লাল আর তার উপর রক্তের ছিটা, ঘায়ের ভেতরে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে মধ্যে থেকে আলোর দিকে কিলবিল কিলবিল করছে, ছোট্ট ছোট্ট সাদা মাথা আর অনেকগুলো খাটো পা। আহারে বেচারা, কোনো কিছুতেই আর কিছু করা সম্ভব নয়। তোমার মহা ক্ষতটা আমি খুঁজে পেয়েছি, তোমার এক পাশের এই ফুলের কুঁড়িটাই তোমার ধ্বংসের কারণ। পরিবারের সবাই এতক্ষনে বেশ খুশী; ওরা নিজের চোখে দেখছে আমি খুব ব্যাস্ত; কথাটা বোন বললো মাকে, মা বললেন বাবাকে, আর বাবা বলে বেড়ালেন কিছু মেহনাদের কাছে, এসব লোকজন চলে এসেছে, খোলা দরজা গলে চাঁদের আলোর সাথে সাথে, পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে নিঃশ্চুপে সাবধানে, দু হাত ছড়িয়ে ভারসাম্য ঠিক রেখে। “আপনি কি আমাকে সারিয়ে তুলবেন?“ কাঁদো কাঁদো গলায় ছেলেটা ফিস ফিস করে বলে উঠলো, এই ক্ষতের যন্ত্রনায় জীবনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। আমার এই জেলায় লোকেরা সবতো সেটাই চায়। সবসময়ই ডাক্তারের কাছে এমন অসম্ভব আশা করে। তারা সব পুরাতন বিশ্বাস জলাঞ্জলী দিয়ে বসে আছে; এ গ্রামের যাজক এখানে এই ঘরে, পরতে পরতে তাঁর পোষাক খুলে ফেলছেন; তবে দুটো সদয় অস্ত্রচিকিৎসাজ্ঞ হস্ত থাকার কারনেই ডাক্তারবাবুকে মনে করা হয় সর্বময়ক্ষমতাধর। তা যাক তাতে যদি ওরা খুশী হয়তো হোক; আমিতো আর জোর করে কারো উপর কিছু চাপিয়ে দেইনি; ওরা যদি আমাকে ধর্মের কাজে লাগিয়ে দেয়, যার যা কাজ না তাকে দিয়ে তাই, আমিও তা-ই করবো; এর চেয়ে আর ভালো কী-ই বা আশা করবো, আমি একজন বৃদ্ধ গ্রাম্য ডাক্তার, এমনকি আমার চাকর-মেয়েটাকেও কেড়ে নেওয়া হয়েছে! ওরা এগিয়ে আসে, পরিবারের সবাই আর গ্রামের গুরুজনেরা, এসে আমার শরীর থেকে জামা কাপড় খুলে নিলো; কোনো এক স্কুলের ছেলে-মেয়েরা মাষ্টারকে সামনে রেখে একেবারে সে বাড়ির সামনেই তাদের নিতান্তই সরল একটা সুরে নিচের কথাগুলো গেয়ে চলেছে:
ওর গায়ের কাপড় সব খুলে নাও, তবে ও আমাদের রোগ সারাবে
তবু যদি না কাজ করে, ওকে মেরে ফেলো মেরে ফেলো
এমনতো কিছু না ভারিতো এক ডাক্তার, গ্রামের ডাক্তার
এখন আমি একেবারেই বিবস্ত্র নিঃশ্চুপ শান্ত এবং চেয়ে চেয়ে ওদের মুখ দেখছি, দাড়িতে আঙ্গুল, মাথা এক দিকে বাঁকানো। আমি পুরোপুরি ওদের নিয়ন্ত্রনে যা হবার তাই হচ্ছে এবং তা-ই হোক, বুঝতে পারছি তাতে আমার কিছুই লাভ নেই, কারন ওরা এবার আমার হাত-পা তুলে নিয়ে উচু করে নিয়ে যাচ্ছে বিছানায়। শুইয়ে দিল আমাকে দেওয়ালে পাশ ঘেসে বিছানায়, যে পাশে ওর ক্ষতটা। তারপর ওরা সবাই বেরিয়ে গেল কামরা ছেড়ে; দরজাটা বন্ধ হলো; বাইরের সমবেত সংগিত থেমে গেলো; চাঁদ ঢেকে গেলো মেঘে; আমার চারিপাশে বিছানাপত্র বেশ গরম গরম; খোলা জানালায় ঘোড়া গুলোর মাথা মনে হচ্ছে যেন ছায়া। “তুমি কি জানো,“ কথাটা ভেসে এলো আমার কানে, “আপনার ওপর কিন্তু আমার মোটেই ভরসা নেই। কেনো জানেন, আপনাকে এখানে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে, নিজের পায়ে হেঁটে এখানে আসেননি। আমাকে সহযোগিতা করবার বদলে আপনি বরং আমার মৃত্যুর পথ আরো কষ্টকর করে তুলেছেন। আমি আসলে এখন মনে প্রাণে চাই আপনার চোখ দুটো খুবলে তুলে নিতে।“ “ঠিক,“ বললাম, “ভীষন লজ্জার কথা। যদিও আমি একজন ডাক্তার। আমার কী করবার আছে বলো? বিশ্বাস করো, আমার জন্যেও ব্যাপারটা মোটেই সহজ নয়।“ “কি মনে হয় আপনার এই স্বীকারোক্তিতেই কি আমার সন্তুষ্ট হওয়া উচিৎ? ওহো,সন্তুষ্টই হওয়া উচিৎ, তাছাড়া আর কিছুই করার নেই। সবসময় সহ্যতো আমাকেই করতে হবে। এত সুন্দর একটা ক্ষত আমি পৃখিবীর বুকে নিয়ে এসেছি; এটাই আমার একার –একেবারে একার কৃতিত্ব।“ “ও ভাই,“ বললাম “তোমার সমস্যা: তোমার দৃষ্টি যথেষ্ট প্রসারিত নয়। আশে পাশের সবকটা রোগীই আমার দেখা, সেই আমি তোমাকে বলছে: তোমার ক্ষত ততটা খারাপ নয়। চিপা এক কোনে কুড়ুলের দুটো বাড়িতেই এই ক্ষত, অনেকে শুধু নিজের পক্ষেই কথা বলে, বনের মধ্যে কুড়ুলের আওয়াজ প্রায় কানেই শোনে না, কাছে চলে আসছে তাও শুনতে পায় না।“ “সত্যি কথা? নাকি আমি জ্বরে পড়ে আছি সেই সুযোগে উল্টা-পাল্টা একটা কিছু বুঝিয়ে দিলেন?“ “আসলেই তা-ই, মনে রেখো এটা সরকারী ডাক্তারের মুখের কথা।“ কথাটা শুনে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। এখন আমার পালাবার চিন্তা করা দরকার। ঘোড়া দুটো এখনো জায়গা মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপ চাপ। ঝটপট আমার পোষাক-আষাক, ফার কোটটা, আমার ব্যাগটা কুড়িয়ে নিলাম; কাপড়-চোপড় পরে আর সময় নষ্ট করতে আমি আর রাজি না; ঘোড়াগুলো যে গতিতে দৌড়ে এসেছে যদি সেভাবে যেতে পারে, তাহলেতো ব্যাস এক লাফে, আসার বেলা যেমন হলো, এই বিছানা থেকে বেরিয়ে ঝপাস একেবারে আমার নিজের বিছানায়। বাধ্যছেলের মতো একটা ঘোড়া ফিরে এলো জানালা থেকে; আমার গাড়িটার দিকে হাতের জিনিষপত্রগুলো সব ছুড়ে দিলাম; ফার-কোটটা জায়গা মতো না পড়ে শুধু একটা আংঠায় একটা হাতা আঠকে ঝুলতে থাকলো। ভালো ভালো। আমি নিজে লাফিয়ে উঠে পড়লাম ঘোড়ার ঘাড়ে। লাগাম আলগা হয়ে আছে, একটা ঘোড়া যাহোক করে আটকানো অন্যটার সাথে, এক্কাটা পেছনে টানছে, আমার ফার কোটটা শেষে গিয়ে পড়লো তুষারে। “হেট-হেট-হুর-হুর!“ বললাম আমি, তবে ঘোড়া দৌড়ালো না; চলছে ধীরে, বুড়ো মানুষের মতো, তুষারের ধ্বংসাবশেষের উপরে আমরা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে চলেছি; অনেকক্ষণ ধরে আমাদের পেছন পেছন বাচ্চাগুলোর নতুন তবে অসম্পূর্ণ একটা গান প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে:
হাসো খেলো গান গাও, ও রোগীর দল
তোমাদের ডাক্তার তোমাদের পাশে
পড়ে আছে, তোমাদেরই বিছানায়
এই গতিতে চললে আমিতো জীবনেও বাড়ি পৌছাবো না; আমার ডাক্তারি পসারের কি হবে; আমার উত্তরসূরিরা সব লুটে পুটে নেবে, তাতে কাজ হবে না, ওরা কখনোই আমার জায়গা নিতে পারবে না; আমার বাড়িতে এখন নচ্ছার এক সহিস ব্যাটা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে; রোজ তার শিকার; না না, আমি আর ওসব নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। বিবস্ত্র, যুগের অসুখীতম তুষারপাতের দিনে উলঙ্গ হয়ে, পার্থিব্য এক বাহনে, অপার্থিব্য দুটো ঘোড়া নিয়ে, আমি এক বুড়ো মানুষ, বিপথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার ফরের কোট এখন এক্কাটার পেছনে ঝুলছে, আমি তার নাগাল পাই না, আর আমার কোনো রোগীও এখন একটু হাত বাড়াচ্ছে না। বিশ্বাসঘাতক! বিশ্বাসঘাতক! রাতের একটা মিথ্যা শব্দ সংকেতে একবার উত্তর দিলে –তাতে কখনোই ভালো হয় না, কোনো ভালো হয় না।

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *