ছায়ার ছোবল

[স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের কাহিনি দ্য বসকোম ভ্যালি মিস্ট্রির রূপান্তর]

সকাল বেলা–আমি তখন বউয়ের সাথে বসে নাস্তা খাচ্ছি, মোবাইলে শার্দুল রায়হানের মেসেস এলো।
lets go to Basabpur for a couple of days. Solid village, fresh air, fresh fish and vegetables. The car will arrive at eleven o’clock.
(দিন দুয়েকের জন্য বাসবপুর যেতে হবে। নিরেট গ্রাম, টাটকা বাতাস, টাটকা মাছ আর শাক সব্জি। এগারোটায় গাড়ি আসবে।)
স্ত্রী-র উৎসাহে যাওয়াই মনস্থ করলাম। ঝট করে জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। যথাসময়ে বাড়ির সামনে সাদা একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো। গাড়িতে বসে স্বয়ং শার্দুল রায়হান। আঁটসাঁট ধূসর পোশাকে দীর্ঘ কৃশ শরীরটা আরও ঢ্যাঙা দেখাচ্ছে।
উঠে বসলাম সেই মাইক্রে বাসে। গাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর আছে ওর অফিসের ড্রাইভার প্রসাদ। তন্ময় হয়ে একগাদা কাগজ পড়ে চলল রায়হান, মাঝে মাঝে কী সব টুকে নিতে লাগল। বলল, কেসটা সম্পর্কে কিছু ধারনা আছে?
খুব জটিল কিছু?
মনে হয় খুব সহজ, সেইজন্যেই খুব জটিল।
ক্রাইমের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
যে-কেস চোখে পড়ার মতো জটিল, জানবে তা পানির মতো সোজা। কিন্তু যা সাদাসিদে গোলমাল তাতেই বেশি। এ-কেসে অভিযোগ আনা হয়েছে যিনি মারা গেছেন, তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে।
খুনের মামলা?
সেইরকমই মনে করা হয়েছে। তাই আমাদের পত্রিকা ‘দৈনিক সকালের খবর‘আমাকে পাঠাচ্ছে কভার করবার জন্য। কিন্তু আমি নিজে তলিয়ে না-দেখা পর্যন্ত কারো কথা শুনে কোনো কিছু মনে করার পাত্র আমি নই। মন দিয়ে শোনো।
বলো।
বাসবপুরর সবচেয়ে বড় বড় ছ‘টা আম বাগানের মালিক হলেন জালাল তরফদার। আফ্রিকা থেকে অনেক টাকা পয়সা রোজগার করে এনে জমিজমা কিনে চাষবাস করছেন। একটা বাগানবাড়ি ভাড়া দিয়েছেন চুন্নু মানিক নামে এক ভদ্রলোককে–ইনিও আফ্রিকা থেকে ফিরেছেন। সেখানেই আগে আলাপ সহ-কর্মি এখানেও তাই প্রতিবেশী হয়ে রয়ে গেলেন। তরফদারের টাকাপয়সা বেশি থাকলেও তা মেলামেশার অন্তরায় হল না। দুজনেরই বউ গত হয়েছে, আর বিয়ে করে নি। তরফদারের এক মেয়ে, মানিকর এক ছেলে–দুজনেরই বয়স প্রায় একই। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ওরা কেউই খুব একটা ওঠা-বসা করে না।
গত সোমবার তেসরা জুন মানিক বিকেল তিনটে নাগাদ ধলাকাটা হাওরে যান–হাতে একটা হুয়িল ছিপ নিয়ে – বাড়ির এক কাজের লোককে বলে যান মাছ মারত যাচ্ছি। আর ফেরেননি।
তার বাড়ি থেকে হাওর সিকি কিলো দূর। দুজন দেখেছে মানিককে যেতে। একজন বুড়ি–নাম জানা নেই। আর একজন বাগানের মালি। মানিকর বেশ একটু পরে পেছনে পেছনে তার ছেলে শরীফকেও যেতে দেখা গেছে। তার মাথায় টুপি, হাতে একটা এয়ারগান ছিল। যেন বাপকে চোখে চোখে রেখে হাঁটছিল ছেলে।
মালির মেয়েও দেখেছে বাপবেটাকে হাওরের ধারে। বনের মধ্যে ফুল তুলছিল মেয়েটা। সেখান থেকেই দেখতে পায় কথা কাটাকাটি হচ্ছে বাপবেটায় ছেলে এমনভাবে একবার হাত তুলল। যেন এই বুঝি মেরে বসবে বাপকে। ভয়ের চোটে মেয়েটা দৌড়ে এসে মাকে সবে ঘটনা বলতে শুরু করেছে, এমন সময়ে ছুটতে ছুটতে শরীফ এসে বললে–বাবাকে এইমাত্র মরে পড়ে থাকতে দেখে এসেছে বনের ধারে। শরীফের তখন বিহুল অবস্থা, মাথায় টুপি নেই, বগলে এয়ারগানটা নেই, হাতে আর আস্তিনে কঁচা রক্ত লেগে আছে। শরীফের সঙ্গে গিয়ে দেখা গেল, সত্যিই মানিকর মৃতদেহ পড়ে রয়েছে হাওরের ধারে
খুব ভারী কিন্তু ভেতা ধরনের কোনো অস্ত্র দিয়ে বেশ কয়েকবার ঘা মেরে খুলি ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঠিক যেন বন্দুকের কুঁদোর মার।
পাশে একটা এয়ারগান আর হুয়িল ছিপ পড়ে পাওয়া গেল একটু তফাতে ঘাসের ওপর। ছেলেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সব শুনে আমি বললাম, এ অবস্থায়তো ছেলে শরীফকেই দোষী বলে মনে হচ্ছে ।
সেভাবে দেখতে গেলে হয়তো অবিচারই করা হবে। শরীফ দোষী হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। শুধু পরিস্থিতি দেখলে হবে না, অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। লোকাল থানার পুলিশ ইন্সপেক্টর লস্কর কেসটা তদন্ত করছে। তারই পাঠানো বার্তায় আমাদের এখন ছুটতে হচ্ছে ঘণ্টায় এক‘শ-বিশ কিলো মিটার বেগে।
কেস তো একেবারে পানির মতো পরিষ্কার।
হাসল রায়হান। বলল, পরিষ্কার ব্যাপারেই অনেক কিছু চোখের বাইরে থেকে যায়। লস্কর যা দেখেনি, আমার চোখে তা পড়তে পারে। যেমন ধর না কেন তোমার বাথরুমের লাইটটা বেসিনের ডান দিকে বেশ খানিকটা দূরে লাগানো, এ জিনিস হয়তো লস্করের চোখ এড়িয়ে যাবে কিন্তু আমার চোখ এড়ায়নি।
সত্যিই অবাক হলাম, কিন্তু তুমি জানলে কী করে?
আমি জানি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফিট-ফাট থাকা তোমার অভ্যেস। রোজ দাড়ি কামাও তুমি সকালে। ঢাকা শহরে, ফ্ল্যাটে নিশ্চয়ই বাথরুমের বেসিনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামাও। কিন্তু দেখছি তোমার দাড়ি বাঁ দিকটা আর নিচেটাও তেমন মশৃন করে কামানো হয়নি। তার মানে কি এই নয় যে, বাথরুমের লাইটটা বেসিনের ডান দিকে, বা গালে আলো কম? খুঁটিয়ে দেখলে এমনি অনেক কিছু আবিষ্কার করা যায়, এই কেসেও সে-সুযোগ আছে বলে আমার বিশ্বাস।
কীরকম?
ছেলেটাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাড়ি ফিরে আসার পর অকুস্থলে নয়। তখন সে বলেছিল, সে নাকি জানত তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে।
তার মানেই খুনের অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া হল।
কিন্তু তারপরেই বলেছে খুন সে করেনি।
কিন্তু তাতে সন্দেহ যায় না বরং বাড়ে।
মোটেই না–সন্দেহ একেবারে চলে যায়। গ্রেপ্তারের সময়ে মেজাজ দেখালেই বরং সন্দেহ হত–পাগলকে পাগল বললেই রেগে যায়। কিন্তু বাপের সঙ্গে কথা কাটাকাটির পরেই বাপ খুন হয়েছে–সুতরাং যে কেউ বলবে খুনি সে-ই–এই সোজা সমীকরণটা সোজা ভাবে যে বলতে পারে, বুঝতে হবে তার মনে পাপ নেই।
কিন্তু ফাঁসি কি তাতে আটকানো যায়? এর চেয়ে কম সন্দেহের জোরে অনেকে ফাঁসিকাঠে উঠেছে।
অন্যায় সন্দেহেও অনেকে ফাঁসিতে ঝুলেছে। ছেলেটি কী বলে? এই কাগজটা পড়লেই বুঝবে,বলে কাগজের একটা জায়গা আমাকে দেখিয়ে দিল রায়হান।
শরীফ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সেই জবানবন্দি। সে বলেছে :
তিন দিন পরে বাড়ি ফিরে দেখলাম বাবা বাড়ি নেই। একটু পরে সাইকেলের আওয়াজ শুনে বুঝলাম, বাবা ফিরেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার ছিপ নিয়েই হনহন করে বেরিয়ে গেল। কোন দিকে গেল বুঝতে পারলাম না। এয়ারগানটা নিয়ে আমি বেরোলাম হাওরের পাড়ে গিয়ে পাখি শিকার করব বলে। রাস্তায় মালি কাকার সঙ্গে দেখা হল। আমি বাবার পেছনে পেছনে চলেছিলাম, সে বলেছে। কথাটা ঠিক নয়। আমি জানতামই না বাবা আমার সামনে আছে। হাওরের কাছাকাছি গিয়ে একটা ব্যেটা ডাক শুনলাম। এভাবে বাবা আমাকে ডাকে। তাই হনহন করে এগিয়ে গিয়ে দেখি লেকের ধারে বাবা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে অবাক হল, কথা কাটা কাটি হলো। সে রেগে গেল, মারতে এল। বাবার মেজাজ খুব উগ্র। আমি আর তর্ক করলাম না, একটু পরে কথা না-বাড়িয়ে চলে এলাম। কিন্তু কিছুদূর আসতে-না-আসতেই বিকট চিৎকার শুনলাম পেছনে। দৌড়ে গিয়ে দেখলাম সাংঘাতিক জখম হয়েছে বাবা–মাথা ছাতু হয়ে গেছে বললেই চলে! এয়ারগানটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম, প্রায় সঙ্গেসঙ্গে মারা গেল বাবা। কাছেই বাড়ি দৌড়ে গেলাম সেখানে। সব বললাম।
পুলিশ জিজ্ঞেস করে, প্রাণটা বেরিয়ে যাওয়ার আগে বাবা কিছু বলেছিলেন?
‘সার‘ সম্বন্ধে কী যেন বলছিল।
মানে কি বুঝলে?
ভুল বকছিল।
বাবার সঙ্গে তর্কাতর্কিটা হল কী নিয়ে?
বলব না।
বলতেই হবে।
তার সঙ্গে এ ব্যাপারের কোনো সম্পর্ক নেই।
সেটা কোর্ট বুঝবে। জবাব না-দিলে তোমার ক্ষতি হবে।
হোক।
ব্যেটা বলে তোমার বাবা তোমাকে ডাকত?
হ্যাঁ! কিন্তু বাবা তো জানতেন না তুমি বাড়ি ফিরেছ? ডাকলেন কেন?
ঘাবড়ে গেল শরীফ। বললে, বলতে পারব না।
বিকট চিৎকার শুনে ফিরে এসে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলে?
সে-রকম কিছু দেখিনি।
তাহলে কোন রকম কী দেখেছিলে?
আমি তখন পাগলের মতো বাবার দিকে দৌড়োচ্ছি–কোনোদিকে খেয়াল নেই। সেই সময়ে মনে হল যেন বাঁ-দিকে ধূসর রঙের কী-একটা পড়ে আছে অনেকটা শুকনো মাটির টিলার মতো।
ঠিক কী বলে মনে হয় জিনিসটা?
খাঁকি রঙ্গের পচাঁ বস্তা বা কাপড়ের মতো কিছু।
ডেডবডি থেকে কতটুকু দূরে পড়েছিল?
পনেরো বিশ হাত।
হুম, ওটাই কী ফিরে এসে আর দেখো নি?
হ্যা।
তুমি হয়তো চোখে ভুল দেখেছো।
হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।
তুমি কেসকে মিস গাইড করছো নাতো?
এতে কেস মিস গাইড হবে কেন?
তাহলে বলতে চাও তুমি বেরিয়ে গেলেই জিনিসটা উধাও হয়ে গেল?
আমি কিন্তু সেদিকে পেছন করে বসে ছিলাম। ভালো করে লক্ষ করি নি।
জেরা এইখানেই শেষ।
পুলিশ ঠিক ঠিক পয়েন্টেই চেপে ধরেছে। এক, বাবা তাকে দেখেনি, অথচ ডাকল কেন? দুই, ঝগড়ার বৃত্তান্ত চেপে যাওয়া। তিন, মরবার সময়ে সার সম্বন্ধে কথা বলেছিলেন মানিক–মানেটা ছেলে বোঝেনি।
রায়হান হাসিমুখে বললে, যে-অসংগতিগুলো দেখে তুমি আর পুলিশ খড়্গহস্ত হয়েছ ছেলেটির ওপর সেগুলোই কি ওর সত্যি কথা বলার প্রমাণ? পুরো ব্যাপারটা বানিয়ে বলার মতো কল্পনাশক্তিই যদি ওর থাকত, তাহলে ওই তিনটে অসংগতি চাপাচুপি দিয়ে চমৎকার তিনটে গল্প শুনিয়ে দিতে পারত। মিথ্যে যে বলে, সে কি গল্পের মধ্যে সন্দেহের বীজ রেখে উদ্ভট অসংগতি শোনাতে চায়? না হে, ছেলেটা সত্যিই বলেছে। এখন আর এ নিয়ে কোনো কথা নয়। এই বইটা পড়তে বসলাম, বিশ মিনিটে ফেরি ঘাটে পৌঁছে লাঞ্চ ।
বাসবপুরে যথাসময়ে পৌঁছোলাম। বেজির মতো ক্ষিপ্র, ইনস্পেকটর লস্কর দাঁড়িয়েছিল বাজারে। চোখে সেয়ানা চাহনি! সান গ্লাসটা চোখে দিয়ে এগিয়ে আসলো। আগে নিয়ে গেল হোটেলে। রুম ঠিক করাই ছিল। চা খেতে খেতে বললো, এখুনি গাড়ি আসছে। সোজা অকুস্থলে চলুন।
গাড়ির দরকার হবে না। তাছাড়া আজ রাতে আর . . .
কেসটা শুনেই সমাধানে পৌঁছে গেছেন? তাই হবে জানতাম। খুবই সোজা কেস। কিন্তু মেয়েটা নাছোড়বান্দা। দৈনিক সকালের খবর-এর ক্রাইম রিপের্টার শার্দুল রায়হান, মানে আপনার সঙ্গে কথা না-বলা পর্যন্ত রেহাই দিচ্ছে না। এই যে এসে গেছে।
একটা পুরানো আমলের পুরাতন গাড়ি এসে দাঁড়াল হোটেলের গেটে। হুড়মুড় করে ঢুকল পরমাসুন্দরী তরুণী, ওলি। উদবেগ উৎকণ্ঠায় সামলাতে পারছে না নিজেকে।
আপনিই শার্দুল রায়হান? পর্যায়ক্রমে আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রায়হানকে ঠিক চিনে নিল মেয়েটা, খুব আনন্দ হচ্ছে আপনাকে দেখে। আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিতে পারি শরীফ নির্দোষ। এইটুকু বয়স থেকে ওকে চিনি। মাছি পর্যন্ত যে মারতে পারে না, সে করবে খুন? ভাইয়া আপনার ওপর আমার ভীষণ ভরসা, আপনার কাছে অনুরোধ, আপনি নিজে তদন্ত করুন।
নিশ্চয় করব, শরীফ যে নির্দোষ তাও আমি বিশ্বাস করি।
অন্য সবাইতো আগে থেকেই ধরে নিয়েছে শরীফই খুনি, লস্করের দিকে ফিরে তাচ্ছিল্যের সুরে বললে মেয়েটা।
লস্কর কাধ ঝাঁকিয়ে বললো, রায়হান সাহেব একটু চিন্তা-ভাবনা করে বলেন কী বলছেন।
কিন্তু হক কথা বলেছেন। শরীফ নির্দোষ। বাবার সঙ্গে ঝগড়ার কারণটা কেন বলেনি জানেন? ওর মধ্যে আমিও জড়িত আছি বলে।
কীরকম? শুধোয় রায়হান।
শরীফের বাবা চান আমার সঙ্গে শরীফের বিয়ে হোক। কিন্তু আমরা ছেলেবেলা থেকে ভাইবোনের মতো পরস্পরকে ভালোবেসে এসেছি। বাপবেটায় প্রায়ই ঝগড়া হত এই নিয়ে।
তোমার বাবা কী বলত?
তার মত নেই। শরীফের বাবা ছাড়া কারোরই মত নেই, বলতে বলতে সুন্দর মুখখানা লাল হয়ে গেল ওলির।
কালকে তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাব ভাবছি।
ডাক্তার বকসি রাজি হবেন বলে মনে হয় না।
কেন?
গত কয়েক বছর ধরেই শরীর খুব খারাপ। তারপর এই ধাক্কায় একেবারে বিছানা নিয়েছেন। হাল ছেড়ে দিয়েছেন ডাক্তাররাও। বিদেশে থাকার সময় থেকেই তো বন্ধুত্ব মানিক চাচার সঙ্গে।
হ্যা শুনেছি একসাথে আফ্রিকায় কাজ করতেন দু‘জনে?
সোনার খনিতে কাজে করতেন।
সোনার খনি, তাই না? টাকা রোজগার করেছেন সেইখানেই?
হ্যাঁ।
খবরটা কাজে লাগবে।
শরীফের সঙ্গে নিশ্চয় দেখা করতে যাবেন জেলখানায়? ওকে বলবেন আমি জানি ও নির্দোষ।
বলব, নিশ্চয় বলব!
আর বসব না, চলি। আব্বার অবস্থা ভালো নয়। বলতে বলতে বেগে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। একটু পরেই শুনলাম পুরাতন গাড়িটার গম্ভীর ভুম ভুম আওয়াজ মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে।
গম্ভীর গলায় লস্কর বললো, কাজটা ভালো করলেন না রায়হান ভাই। মিথ্যে আশা দিলেন মেয়েটাকে!
লস্কর সাহেব, আমি শরীফকে খালাস করতে পারব এ-বিশ্বাস আমার আছে। জেলখানায় গিয়ে দেখা করার অনুমতি পাবতো আমি?
চলেন, আপনি আর আমিই তো?
তাহলে চরেন বেরিয়ে পড়া যাক এ-বেলা।
ওয়াসিক, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফিরছি আমি।
এই দুটো ঘণ্টা যেন আর কাটতে চাইল না আমার। ওদেরকে গাড়িতে তুলে দিয়ে একটু এদিক-ওদিক ঘুরে হোটেলে ফিরলাম। একটা উপন্যাস পড়বার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মন চলে আসতে লাগল খুনের রহস্যে। বিরক্ত হয়ে বই ফেলে ভাবতে বসলাম। রায়হানের খাতিরেই যদি ধরি ছেলেটা সত্যি বলছে, তাহলে সে বাবার কাছ থেকে চলে আসার সময় থেকে আরম্ভ করে বাবার চিৎকার শুনে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছিল। আবার, বাবার কাছে থেকে একটু সরে যাওয়ার মাঝখানে কেউ সেখানে এসে ধূসর জিনিসটা সরিয়ে নিয়ে গেছে। নাকি ততক্ষণে জিনিষটা পানিতে ডুবে গেছে, বা নিজেই দূরে চলে গেছে, ভারি আশ্চর্য ব্যাপার তো! জিনিসটা কী? খুনির পোশাক, নাকি অন্য কিছু? আমি নিজে উকিল। কাজেই আঘাতের ধরনটা অনুধাবন করতে গিয়ে দেখলাম, চোট লেগেছে খুলির পেছনকার বাঁ-দিকের হাড়ে–গুড়িয়ে গেছে ভারী কোনো জিনিষের আঘাতে। অথচ ছেলেটিকে দেখা গেছে বাপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতে। অবশ্য এ-যুক্তির কোনো মানে নেই। বাপ পেছন ফিরতেই হয়তো হাতিয়ার চালিয়েছিল শরীফ। কিন্তু মরবার ঠিক আগে সার বলে বিড়বিড় করতে গেলেন কেন মানিক সাহেব? এ সময়ে আচমকা আঘাতে কেউ তো আবোল-তাবোল বকে না? কী বলতে চেয়েছিলেন ভদ্রলোক?
রায়হান একা ফিরল অনেক দেরিতে–লস্কর শহরে থেকে গেছে।
আসন গ্রহণ করে বললে, অকুস্থলে পৌঁছোনোর আগে বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেলে মুশকিলে পড়ব।–শরীফের সঙ্গে দেখা হল জেলখানায়।
কী মনে হল? অন্ধকারে আলো দেখাতে পারল শরীফ?
একেবারেই না। প্রথমে মনে হয়েছিল খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। পরে দেখলাম নিজেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে। খুব চৌকস নয় ছেলেটা, কিন্তু সুদর্শন। মনটা পরিষ্কার।
মিস ওলির মতো মেয়েকে বিয়ে করতে যে চায় না, তার পছন্দরও খুব একটা তারিফ করা যায় না।
আরে এর মধ্যেও একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা রয়েছে। ছেলেটা রাজশাহী শহরে কলেজে পড়াশুনার সময়ে একটা অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ে। তাকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে পর্যন্ত করে। বোকা আর বলে কাকে। কাউকে কথাটা বলাও যাচ্ছে না। এদিকে বদমেজাজি বাবার কাছে ধমক খেতে হচ্ছে ওলিকে বিয়ে করতে চাইছে না বলে। হাত-পা ছুঁড়ে লেকের পাড়ে প্রতিবাদ জানিয়েও লাভ হয়নি। সত্যি কথাটা বললেই তো বাড়ি থেকে বার করে দেবে বাবা–গুমরে গুমরে তাই মরছে। তিন দিন রাজশাহীতে স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পরেই খুন হয়ে গেল বাবা। কাগজে খবরটা পড়ে মেয়েটা, শরীফের ফাসি হবেই বুঝতে পেরে নিজে থেকেই ভেগে পড়েছেল। সাংবাদিকদের বলেছে, শরীফ ওর ভালো বন্ধু, এক সাথে কলেজে পড়তো। তাছাড়া আর কিছু নয়। অনেক দিন ওদের দেখা হয় না।
বেশ, তাহলে শরীফ যদি খুন না-করেই থাকে, তাহলে করলটা কে?
দুটো ব্যাপার নিয়ে তোমাকে ভাবতে বলব। এক নম্বর হল, শরীফের বাবা জানতেন না ছেলে বাড়ি ফিরেছে–তা সত্ত্বেও তিনি ব্যাটা বলে ডেকেছিলেন। দু-নম্বর হল, লেকের পাড়ে যার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সে আর যেই হোক তার ছেলে নয় কারণ উনি জানতেন ছেলে এ-তল্লাটেই নেই। চলো খেয়ে আসি চলো।
সকাল বেলা গাড়ি নিয়ে এল লস্কর। আকাশ নির্মেঘ। রাতেও বৃষ্টি হয়নি। মানিক সাহেবের বাড়ি আর হাওরের দিকে রওনা হলাম আমরা।
যেতে যেতে লস্কর বললে, তরফদার আর বাঁচবে কি না সন্দেহ।
বয়স অনেক হয়েছে বুঝি? রায়হান বললে।
ষাট বছর তো বটেই। শরীরের ওপর অনেক অত্যাচার করেছে বিদেশে থাকার সময়ে। এমনিতেই কাহিল ছিলেন, বন্ধু মানিকর মৃত্যুতে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। বন্ধুর জন্যে কম করেননি–বাড়ির ভাড়া পর্যন্ত নেন নি।
তাই। খবরটা ভালো।
বিনা ভাড়ায় শুধু থাকতেই দেননি, আরও অনেক উপকার করেছেন মানিকর–পাঁচজনে বলেছে।
তাই নাকি! একটা ব্যাপারে কি আপনার খটকা লাগেনি ইন্সপেক্টর লস্কর?
কী বলুন তো?
এত উপকার করা সত্ত্বেও মেয়ের সঙ্গে মানিক সাহেবের ছেলের সাথে নিজের মেয়ে বিয়ে দিতে তরফদার রাজি ছিলেন না। অথচ মানিক বিয়ের কথা সমানে বলে যাচ্ছে–যেন খুবই স্বাভাবিক প্রস্তাব। মেয়েটি কিন্তু তরফদার মরে গেলেই তার সব সম্পত্তি পাবে। কারন তরফদারের আর কেউ নেই। কী? আঁচ করতে পারলেন?
ঘটনার ঠেলায় অস্থির হয়ে পড়েছি, আঁচ করার হেপা আর পোয়াতে পারছি না।
তা ঠিক। ঘটনার ঠেলায় আপনি হিমশিম খাচ্ছন, গম্ভীর গলা রায়হানের।
চটে গেল লস্কর। আপনি কিন্তু এখনও মরীচিকা দেখছেন। ভুল পথ ধরেছেন।
মরীচিকা! তা মরীচিকাতো কুয়াশার চাইতে ভালো! হেসে বললে রায়হান। এই যে, এসে গেছে মানিক সাহেবের বাড়ি।
বেশ বড়ো বাড়ি। দোতলা। সদ্য শোকের ছাপ সর্বত্র। দরজায় ধাক্কা দিতেই একটা মেয়ে বেরিয়ে এল। রায়হান তার কাছে দু-জোড়া জুতো চাইল। মারা যাওয়ার সময়ে মি. মানিক যে বুট পরে ছিলেন, সেইটা। আর তার ছেলের একজোড়া বুট।
জুতো এল। ফিতে বার করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাত আট রকম মাপ নিল রায়হান। তারপর রওনা হলাম হাওরের দিকে।
এবং পালটে গেল ওর চোখ-মুখের চেহারা। যেন শিকারি কুকুরের মতো আত্মনিমগ্ন আর হন্যে হয়ে উঠেছে ও। ভুরু কুঁচকে ইস্পাত-কঠিন চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে, দু-কাঁধ বাঁকিয়ে, নাকের পাটা ফুলিয়ে হনহন করে হেঁটে যায় হেঁট মাথায়।
ধলাকাটা হাওরকে একটা বড়োসড়ো দিঘি বললেই চলে। একদিকে তরফদারের বাড়ি আর একদিকে মানিকের বাগানবাড়ি। হাওর ঘিরে আগাছা, ঘাস, জঙ্গল আর জলাজমি। এইখানে একটা ঘাস জমির ওপর পাওয়া গেছে মৃতদেহ। বেশ ভিজে জায়গা। রায়হান শিকারী কুকুরের মতো আবার দৌড়াদৌড়ি আরম্ভ করেছে।
রায়হান মাঠে নামল, গেল হাওরের ধারের জঙ্গলে। জলা জায়গায় অসংখ্য পদচিহ্ন। রায়হানের নজর সব দিকেই। কখনো জোরে যাচ্ছে, কখনো আস্তে। মাঠটাকেও চক্কর দিয়ে এল একবার।
রকম-সকম দেখে অবজ্ঞার হাসি হাসছে লস্কর।
আমার কৌতূহল কিন্তু বেড়েই চলেছে।
অনেক কিছুই দেখতে পাচ্ছে। ঘাসজমির উপর পায়ের দাগ বিস্তর।
হঠাৎ ফিরল লস্করের দিকে, এখানে কী করতে এসেছিলেন, পায়চারী করতে?
দেখছিলাম হাতিয়ারটা যদি পাওয়া যায়।
খুব ভালো কাজ করেছন! পায়ের ছাপগুলোর বারোটা বাজিয়ে বসে আছন। আপনার পায়ের ছাপেই সব জায়গা! উফ! এর চাইতে একপাল মোষ এলেও বুঝি এ-রকম হত না! চিনতে পারছেন এই জুতোর দাগটা? আপনার জুতো!
আর এই যে বড় সাহেব দলবল নিয়ে কর্তব্য করে গেছেন–এখানে–ডেডবডির চারধারে ছয় থেকে আট ফুট পর্যন্ত জায়গায় যত পায়ের ছাপ ছিল, মাড়িয়ে দফারফা করে গেছেন। আ! এই যে একজোড়া পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। একদম আলাদা দাগ দেখছি, বলতে বলতে ভিজে মাটিতে বর্ষাতি বিছিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল রায়হান। আতশকাচ বার করে মাটির ওপরকার বুট চিহ্ন দেখতে দেখতে যেন স্বগতোক্তি করে বলল, এই হল গিয়ে ছেলেটার জুতোর দাগ। দু-বার যাতায়াত করেছে–তারপরে টেনে দৌড়েছে। দৌড়েছে বলেই গোড়ালির ছাপ প্রায় ওঠেনি চেটোর ওপরেই ভর পড়েছে বেশি। তার মানে, ছোকরা খাঁটি কথাই বলেছে। বাপের চিৎকার শুনে দৌড়ে এসেছিল। আর এইখানে পায়চারি করছিলেন ওর বাপ চুন্নু মানিক। পাশেই বন্দুকের কুঁদোর দাগ–বাপ বেটায় কথা হচ্ছিল এখানে। আরে! আরে! ওইটা আবার কী! বুটের মালিক একবার এল–আবার গেল–আবার এসেছে দেখছি… ও হ্যাঁ, চাদরটা কুড়িয়ে নিতে এসেছিল। কিন্তু এল কোত্থেকে? দেখা যাক।
চেনা গন্ধ পেয়ে ব্লাড হাউন্ড যেভাবে নাক নামিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োয়, রায়হানও এবার সেইভাবে মাটি দেখতে দেখতে দৌড়োতে লাগল। পেছনে ছুটলাম আমরা। এসে পৌঁছোলাম বনের ধারে। আরও কিছুদূর গেল রায়হান। উপুড় হয়ে বসে পড়ে মাটি পরীক্ষা করল আতশকাচ দিয়ে। শুকনো পাতা-টাতা সরিয়ে ধুলোর মতো খানিকটা বস্তু নিয়ে খামের মধ্যে ভরল। খুশিতে চোখ-মুখ বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আশপাশ আবার দেখল আতশকাচের মধ্যে দিয়ে। এবড়োখেবড়ো একটা পাথর নিয়েও তন্ময় হয়ে রইল অনেকক্ষণ। শ্যাওলার মধ্যে পড়ে ছিল পাথরটা। গেল বড়োরাস্তা পর্যন্ত।
ফিরে এসে সহজ গলায় বললে, ইন্টারেস্টিং মামলা। ডান হাতি বাড়িটা নিশ্চয় তরফদারের। তোমরা এগোও–আমি আসছি তরফদারের বাড়িতে দেখা করে।
মিনিট দশেক পরে রায়হান এল। গাড়ি ছুটল শহরের দিকে।
রায়হানের হাতে শ্যাওলায়-পড়ে-থাকা সেই পাথরটা দেখলাম। লস্করের হাতে তুলে দিয়ে বললে, এই নিন হত্যার হাতিয়ার।
কী করে বুঝব যে এটা দিয়েই খুন করা হয়েছিল? গায়ে তো কোনো দাগ দেখছি না।
না, দাগ নেই। কিন্তু এটা যেখানে পড়ে ছিল, তার তলায় ঘাস ছিল। কোত্থেকে তুলে এনে ফেলা হয়েছে, তাও দেখতে পাইনি। যে ধরনের চোট দেখা গেছে খুলিতে, এই পাথর দিয়েই
তা সম্ভব।
খুনটা করেছে কে?
সে বেশ লম্বাপানা, বা-হাতি, ডান পা টেনে টেনে চলে, পায়ে বুট পরে, ছাই রঙা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকে, ভারতীয় পাতার বিড়ি খায়, পকেটে ভোতা একটা ছোট ছুরি রাখে। এতেই হবে আপনার?
হেসে ফেলল লস্কর, কোর্টে গ্রাহ্য হবে না যা বললেন। কল্পনার কারবার চলে না আইনে।
আস্তে আস্তে রায়হান বললে, তাহলে আপনি আপনার পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যান–আমি চলি আমার কায়দায় । সন্ধেবেলায় ঢাকা রওনা দেবো ভাবছি।
সে কী! তদন্ত শেষ না-করেই?
আরে না, শেষ করেই যাব।
সমস্যার সমাধান?
সে তো হয়ে গেছে।
খুনি কে?
যার বর্ণনা দিলাম।
তার নাম?
খুঁজলেই পেয়ে যাবেন–খুব একটা লোকজন এ-তল্লাটে নেই।
খোঁড়া বা-হাতি লোকের সন্ধানে নামতে বললে হেসে কুটিপাটি হবে আমার থানার লোকজন!
রায়হান শুধু বলল, সূত্র দিয়ে দিলাম আমার রিপোর্টিং শেষ। এসে গেছে আস্তানা।চলে গেল লস্কর। আমরা ফিরলাম হোটেলের ডাইনিংয়ে। খেতে বসে বিশেষ কথা বলল না রায়হান। মুখ দেখে বুঝলাম, দোটানায় পড়েছে।
খাওয়া শেষ হল। রায়হান বললে, ওয়াসিক, এ মামলায় দুটো অত্যন্ত আশ্চর্য ব্যাপার শুনে নিশ্চয় তোমার খটকা লেগেছে। এক হল, ব্যাটা ডাক। দুই, মরবার সময়ে সার শব্দটা বলা। ব্যাটা বলে ডেকেছিল, ডাকেছিল ‘ঐ ব্যাটা‘ বলে। ঢাকায় থাকা অনেকেই অতি পরিচিত কাউকে এইভাবে ডাকে। মানিক সাহেব যাকে ডেকেছিল, সে-ও তার অতি পরিচিত কেউ একজন। দুজনেই অতি পরিচয়। দেখাও করতে গিয়েছিলেন তার সঙ্গিই, সে ছেলেকে ডাকেননি।
সার-সার বলতে বলতে মারা গেলেন কেন?
পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে টেবিলে বিছিয়ে ধরল রায়হান।
বলল, এই হল ম্যাপ। এক জায়গা হাত চাপা দিয়ে বললো কী আছে পড়ো তো?
-sar
হাত তুলে বলল, এবার?
Kolsar, এই নামটাই মরবার আগে বলেছিলেন মানিক সাহেব?
ছেলে শুধু শুনতে পায় সার, শেষটুকু।
নামটা নিশ্চয় খুনির।
ভারতের একটা ছোট্ট শহরের নাম কলসার
অদ্ভুত ব্যাপার তো!
তিন নম্বর অদ্ভুত ব্যাপার হল সেই মেটে রঙ্গের জিনিষটা–ওটা আসলে একটা গায়ের চাদর। তাহলে দাঁড়ালো কী? ভারতের সেই ছোট্ট শহর গায়ে একটা ধূসর চাদর জড়িয়ে এসে ডাঙশ মারার মতো পাথর ছুড়ে মেরে খুন করে গেছে মানিক সাহেবকে। পরিষ্কার?
নিশ্চয়।
তাহলে তো এ-অঞ্চলটা কলসার দিয়ে আসা সেই লোকটার নখদর্পণে। কেননা হাওরে পৌঁছোনোর দুটোই তো রাস্তা–একটা ভিক্টিমের নিজের বাড়ি থেকে, আর একটা তরফদারের বাগানবাড়ি দিয়ে।
ঠিক, ঠিক।
জমি পরীক্ষা করে খুনির দেহের যে-বর্ণনা মাথামোটা লস্করকে শোনালাম, তুমিও তা শুনেছ।
শুনেছি ঠিকই, কিন্তু কীভাবে অত খবর জানলে বুঝিনি। কতখানি লম্বা, সেটা না হয় দুটো পায়ের ছাপের মধ্যে ফাঁকটা দেখে আন্দাজ করলে। জুতোর চেহারাও ছাপ দেখে বলা যায়। কিন্তু এক পায়ে খোঁড়া জানলে কী করে?
ডান পা সবসময়ে আলতোভাবে জমি ছুঁয়ে গেছে–চাপ পড়েনি। পা টেনে চলে বলেই অমন হয়েছে।
কী করে বললে সে বাঁ-হাতি, মানে লেফ্ট- হ্যান্ডেড?
খুলির পেছনে হাড় কীভাবে গুঁড়িয়েছিল, তুমি জান। চোট লেগেছিল বাঁ-দিক ঘেঁষে। অর্থাৎ বাঁ-হাতে পাথর মেরেছে খুনি। বাপ-বেটায় ঝগড়ার সময়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে বিড়ি খেয়েছে আর ছাই ঝেড়েছে। ছাই দেখেই বুঝলাম, ওটা ভারতিয় পাতার বিড়ি। কিছুদূরে গিয়ে পেলাম বিড়ির গোড়া–ফেলে দেওয়া হয়েছে।
বুঝেছি —
ঠিক এই সময়ে দরজা খুলে গেল। হোটেলের চাকর একজন আগন্তুককে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বললে, ওলির বাবা জালাল তরফদার।
ভদ্রলোকের চেহারাটা দেখবার মতো। বার্ধক্যের ভারে কাঁধ ঝুলে পড়েছে, পা টেনে টেনে হাঁটছেন, বলিরেখা আঁকা রুক্ষ মুখটি কিন্তু দুর্জয় মনোবলের প্রতিচ্ছবি। গালে দু-চার দিনের বাসি দাড়ি, কার্নিশের মতো জটিল ভুরু–খানদানি, শক্তিমান চেহারা। কিন্তু মুখে যেন রক্ত নেই, ঠোট আর নাকের খাঁজ নীল হয়ে এসেছে।
প্রশান্ত কণ্ঠে রায়হান বললে, বসেন।
আপনি চুপি চুপি বলে আসলেন, কেলেঙ্কারি যদি না-চান, তাহলে আপনার সঙ্গে যেন এখানে একা একা এসে দেখা করি।
ইয়েস একা একা, নিজে আপনার ওখানে তাই কিছু বলি নি, মানে কিছু জানতে চাই নি।
বলেন কী জানতে চান? কথাটা জিজ্ঞেস করলেন বটে, কিন্তু ক্লান্ত আর হতাশ চোখ দেখে মনে হল জবাবটা তিনি জানেন।
চোখে চোখে চেয়ে রায়হান বললো, আপনি ছোটবেলা থেকেই ভালো ডাঙশ ছুড়তে পারতেন, নাকি পরে প্রাকটিস করে রপ্ত করেছেন। আপনারতো আবার বাঁ হাত চলে, তাই না?
ছোটবেলা থেকেই আমি ডাঙশ মেরে মেরে গাছের ফল পাড়তাম, পাখি শিকার করতাম। বড় হয়ে আরো প্রাকটিশ করে করে . . . কিন্তু আপনাকে কে বললো আমি ডাঙশ ছুড়তে পারি?
বেশ, তাহলে ধরে নিন মানিক হত্যা ঘটিত সব ব্যাপার আমি ধেরে ফেলেছি!
দুই করতলে মুখ লুকিয়ে গুঙিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ তরফদার।
বললেন জড়িত স্বরে, তাহলে আমার কাছে আর কী জানতে চান?
আপনাদের কি সত্যি আফ্রিকায় দেখা হয়েছিল?
কেন?
আফ্রিকার কোন সোনার খনিতে আপনারা কাজ করতেন?
না, আমরা কখনোই আফ্রিকায় যাই নি
আপনারা ছিলেন ভারতের কালসারে।
জালাল তরফদার চুপ করে থাকলো
এই মিথ্যাটা প্রচার করেছিলেন কেন?
আমি এত টাকা পয়সা আর সোনা-দানা নিয়ে দেশে ফিরেছিলাম যে ভারত বললে কেউ বিশ্বাস করতো না।
শুনে খুশি হলাম।
মিথ্যাটা বলে ফেলেছিলাম অবস্থার পরিপেক্ষিতে, পরে আর সত্যটা কবুল করিনি মেয়েটার কথা ভেবে।
দেখুন ভাই, আমি সরকারের লোক, পুলিশ বা গোয়েন্দা নয়। রিপোর্ট নিতে এসে নাক গলিয়েছি স্রেফ আপনার মেয়ের পীড়াপীড়িতে। আপনার মেয়ে যা চায়, আমিও তাই চাই–শরীফের গায়ে যেন আঁচ না-লাগে।
রোগে রোগে আমি শেষ হয়ে এসেছি, –বড়োজোর আর মাসখানেক আমার আয়ু। মৃত্যুটা বাড়িতেই হোক, ভেবেছিলাম জেলে যেন না মরতে হয়।
খুনটা তাহলে আপনিই করেছেন?
আমি বুঝিনি ছেলেটা ফেসে যাবে। ছোট বেলা থেকে আমার কোলে পিঠে বড় হয়ে উঠেছে আমার মেয়ের সাথে।
কলম আর কাগজ নিয়ে রায়হান বললে, আপনি বলুন কী করেছেন, আমি লিখে নিচ্ছি। সাক্ষী এ্যডভোকেট ওয়াসিক রহমান। শরীফকে যদি কোননামতেই আর বাঁচানো না-যায়, শুধু তখনই প্রকাশ করব এই স্বীকারোক্তি।
শুধু দেখবেন, ওলি যেন এই ঘটনা শুনে কষ্ট না-পায়। অবশ্য মামলা শেষ হওয়ার আগেই আমি শেষ হয়ে যাব।
এই মানিক শয়তানটাকে আপনারা কেউই চেনেন না। গত বিশ বছর ধরে সে আমার জীবন বিষিয়ে তুলেছিল।
ষাট দশকের গোড়ার দিকে আমরা ডাকাতি করতাম কালসারে। রক্ত তখন গরম। অসৎ সংসর্গে মিশে ছ-জনের দল গড়লাম।
চলন্ত গাড়ি থামিয়ে লুঠতরাজ করেছি, আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ছিনতাই করেছি। কলসারে এক সময় বাউয়া জ্যাকের নাম শুনলে শিউরে উঠত ওখানকার মানুষ।
একবার একটা ব্যাংক গাড়ি লুঠ করলাম। ছ-জন পাহারাদারের চারজনকে আমরা খতম করলাম–ওরা খতম করল আমাদের তিনজনকে। ড্রাইভারের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে গাড়ি দাঁড় করালাম–সে কিন্তু আমাকে খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছিল। উচিত ছিল মাথাটা তখনই উড়িয়ে দেওয়া।
এই ড্রাইভারটাই হল চুন্নু, এখনকার মানিক। সব টাকা পয়সা সোনা দানা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে দল ভেঙে দিলাম। আর কুকাজ নয়, এবার সৎকাজে পুরানো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করব–এই মনস্থ করে দেশে ফিরলাম, জমিজায়গা কিনলাম, বিয়ে করলাম, মেয়ে হল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এই মেয়েই আমাকে বাড়িতে টেনে রেখেছে–ছন্নছাড়া হতে দেয়নি।
এই সময়ে একদিন রাজশাহী শহরে দেখা হয়ে গেল চুন্নু মানিকর সঙ্গে। অবস্থা রাস্তার কুত্তার মতো। আমাকে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করলো। নিয়ে আসলাম ওকে এখানে। পুলিশের ভয় দেখিয়ে সে আমার সবচেয়ে ভালো জমি বিনা ভাড়ায় ভোগ করতে লাগল, টাকাপয়সা যখন-তখন চেয়ে নিত। নইলে পুলিশকে খবর দেবে–এই হুমকি দিয়ে চলল সমানে। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল আমার। ওলি বড়ো হওয়ার পর তার নিগ্রহের মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। ওলি পাছে আমার অতীতের দুষ্কর্ম জেনে ফেলে, এই ভয়ে আমি সিটিয়ে থাকি দেখে একদিন চেয়ে বসল ওলিকেই।
কিন্তু এইবার আমি বেঁকে বসলাম। ওই ড্রাইভারের বাচ্চার নোংরা রক্ত আমার জীবনটা শেষ করে এখন আমার মেয়েকে চায়। আমি জানি ওর উদ্দেশ্য আমার সর্বস্ব গ্রাস করা। আমার আয়ু যে ফুরিয়ে এসেছে, সে-খবর ও জানত। শরীফ ছেলেটার ওপর আমার কিন্তু বিতৃষ্ণা নেই কিন্তু হাজার হলেও শয়তান চুন্নু মানিকর ছেলে সে।
ঠিক করলাম বোঝাঁপড়া করা যাক। হাওরের পাড়ে দেখা করার ব্যবস্থা হল। গিয়ে দেখি ছেলের সঙ্গে তর্ক হচ্ছে চুন্নুর। আড়ালে দাঁড়িয়ে বিড়ি খেতে খেতে শুনলাম, ছেলেকে বোঝাচ্ছে আমার মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে। এমনভাবে খেপাচ্ছে শরীফকে যেন আমার মেয়ে একটা বাজারের মেয়ে।
শুনতে শুনতে মেজাজ বিগড়ে গেল, অন্তরাত্মা বিষিয়ে উঠল। মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল। আমার দিন তো ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু এই শয়তান বেঁচে থাকলে যে আমার জীবনে সুখ শান্তি কিছুই থাকবে না। ভাবতে গিয়ে মাথায় রক্ত চড়ে গেল। ঠিক করলাম, আর না। ওকে খতমই করব।
তাই ওকে খুন করলাম পাথর ছুড়ে মেরে। মরণ-চিৎকার শুনে শরীফ এসে পড়বার আগেই পালিয়ে গেলাম। কিন্তু আবার ফিরে আসতে হল ফেলে যাওয়া চাদরটা নিয়ে যাওয়ার জন্যে।
রায়হান সব লিখে নিল, মানিককে দিয়ে সই করিয়ে নিল।
তারপর বললে, আপনার বিচারের আয়োজন হচ্ছে ওপরকার বড়ো আদালতে –এ-আদালতে তাই এই স্বীকারোক্তি আমি আর পেশ করব না। কিন্তু যদি দেখি বিনা দোষে সাজা পেতে যাচ্ছে শরীফ, তাহলে তাকে বাঁচানোর শেষ উপায় হিসেবে এই স্বীকারোক্তি আমি কাজে লাগাব। তদ্দিন এ-লেখা আমার কাছেই থাকবে। আপনার মৃত্যুর পরেও থাকবে। কেউ জানবে না।
আঃ, বাঁচালেন। এবার আমি শান্তিতে মরতে পারব, বলে পা টেনে টেনে স্খলিত চরণে নিষ্ক্রান্ত হলেন বিশালদেহী বৃদ্ধ তরফদার।
আদালতে স্বীকারোক্তি পেশ করার আর দরকার হয়নি–অন্যান্য প্রমাণের জোরে শরীফকে খালাস করে আনে রায়হান। মি. তরফদার এখন পরলোকে। আশা করি তার মেয়েকে নিয়ে সুখে ঘরকন্না করছে শরীফ। আজও জানে না ওরা, কী কুটিল ছায়ায় একদিন অন্ধকার হয়ে এসেছিল তাদের অতীত জীবন।

 আশরাফ উল আলম শিকদার

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *