হ্যাবাদী/নাবাদী, বের্টল্ড ব্রেখ্ট

ব্রেখ্টক্রিত সর্বশেষ সংশোধন ও সংযোজনসহ
চরিত্র: শিক্ষক, বালক, মা, তিনটি ছাত্র, কোরাশ

য দি ব লে হ্যা

১ম অংক

কোরাশ:
সব বিদ্যার চাইতে বড় বিদ্যা, যুক্তি বিদ্যা ভাই
কেউ বলে এ খুব খাটি কথা, কেউ বলে এ কথায়ে কোন যুক্তি নাই
কারো কাছে জানতে চাওয়া হয় না কিছুই, তবু কেউ
বলতে পারে এ সব ডুমুর গাছের ফুলরে ভাই, ডুমুর গাছের ফুল, তাই:
সব বিদ্যার চাইতে বড় বিদ্যা, যুক্তি বিদ্যা ভাই

১নং স্পেসে শিক্ষক, ২নং স্পেসে বালক আর মা।
শিক্ষক: আমি একজন শিক্ষক। শহরের মন্দির প্রাঙ্গনে আমার স্কুল। ওখানে আমার কাছে একজন ছাত্র পড়ে যার বাবা মারা গেছেন; একাকি ওর মা দেখা শোনা করে ওকে বড় করে গড়ে তুলছে। বাড়ি ফেরবার পথে আজ ওদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আমি শীর্ঘ্রই একবার পাহাড়ে যাবো,১ <কারন, আমাদের এই এলাকায়ে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে, আর পাহাড়ের পাদদেশে বেশ কয়েকজন ভাল চিকিৎসক বসবাস করেন>তাই ভাবলাম যাবার আগে দেখা করে বিদায় নিয়ে আসি। (সে দরজায় নক-নক করে) বাসায় কেউ আছে?
বালক: কে ওখানে? স্যার এসেছেন, আমার শিক্ষক আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন!
শিক্ষক: অনেক দিন হলো তুমি স্কুলে আসছো না, স্কুলে আসছো না কেন?
বালক: আমার মা অসুস্থ্য, তাই অনেক দিন স্কুলে যেতে পারিনি।
শিক্ষক: আমিতো কিছুই জানতাম না। আচ্ছা এখন তোমার মাকে বল আমি এসেছি।
বালক ( ২নং স্পেসের দিকে তাকিয়ে কথা বলে ): মা, স্যার এসেছেন
মা ( ২নং স্পেস থেকে কথা বলে ): ওনাকে ভেতরে আসতে বলো।

বালক ও শিক্ষক দু’জনে ২নং স্পেসে প্রবেশ করে।
শিক্ষক: আনেক দিন আগে একবার আপনার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। আপনার ছেলে বললো, আপনি নাকি বেশ অসুস্থ্য। এখন কেমন আছেন?
মা: হ্যা হ্যা, আমি এখন বেশ সু্ম্থ্য। এ তেমন দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই।২ <বলতে খারাপ লাগছে, তবু বলি আমি এখনো বেশ অসুস্থ, কারন এ রোগের কোনো ওষুধের কথা এখন অব্দি কারো জানা নেই>
শিক্ষক: আপনার কথা শুনে বেশ ভাল লাগলো।৩<কিছুনা কিছুতো পাওয়া যাবেই> আসলে আমি এসেছিলাম বিদায় জানানোর জন্যে, বলতে এসেছিলাম যে, দু’চার দিনের মধ্যেই আমি কয়েকজন কে নিয়ে পাহাড়ে একটা কাজে যাবো।৪<আগামীকাল একটা দলের দায়িত্ব নিয়ে আমি পাহড়ে যাচ্ছি কিছু ঔষধের খোজে। ওপাশের ডাক্তারদের কাছ থেকে রোগ নিরাময়ের কিছু পরামর্শ আনবো> শুনেছি ঐ পাহাড়ের ও পাশে নীচে একটা শহর আছে সেখানে নাকি অসামান্য কিছু শিক্ষক থাকেন। তাদের সাথে দেখা করে কিছু শিখেও আসবো।
মা: বুঝেছি, গবেষনার,৫<জনসেবার> কাজে পর্বতারোহনে যাবেন! বেশ বেশ, ভাল, আমিও শুনেছি ওখানে অনেক ধন্বন্তরি ডাক্টার থাকেন; আবার কেউ কেউ বলে ওজায়গায় পৌছানো নাকি মুখের কথা নয়, পথ সাংঘাতিক বিপদ সংকুল। আপনি কি আমার ছেলেকে আপনার সাথে নিতে চাইছেন?
শিক্ষক: না না, এ যাত্রা মোটেই অল্প বয়সীদের উপযুক্ত নয়।
মা: ৬ আশা করি, আপনি ভালয়ে ভালয়ে ফিরে আসবেন।<বেশ,ভালো>
শিক্ষক: আজ তাহলে আসি। ভাল থাকবেন, আমার জন্য দোয়া করবেন।
বালক এবং মা: ভাল থাকবেন, স্যার।

বালক: স্যার, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।
শিক্ষক: বল কি বলবে বলো?
বালক: স্যার, আমিও মনস্থির করে ফেলেছি যে, আমি পাহাড়ে যাবো।
শিক্ষক:
তোমার মাকেতো বুঝিয়ে বলেছি
এপথ ভীষণ দুর্গম পথ
এ খুব সাংঘাতিক পথ। তাই তোমায়ে নিয়ে
যেতে পারিনা। আরো বলি
তুমি কি করে ভাবলে
মাকে একা ফেলে তুমি পাহাড়ে যাবে?
তোমার মা, অসুস্থ্য, তুমি ছাড়া তার কাছে কে রবে।
তার দেখাশোনা করা তোমার একমাত্র কাজ
আমার সাথে ঘুরতে যাবার বায়না ছাড় আজ।
বালক:
আমার অসুস্থ্য মায়ের কারনেই যেতে চাই
আপনার সাথে, যাতে পাহাড়ের নীচে সেই শহরটা খুজে পাই
আর জ্ঞানি চিকিৎসকদের কাছে পেতে পারি
মায়ের জন্য ঔষধ আর ব্যবস্থাপত্রাদি
শিক্ষক: তাহলেতো আরো একবার তোরার মায়ের সাথে আমার কথা বলা দরকার। ( শিক্ষক স্পেস২তে ফিরে যায়, বালক আড়ি পেতে কথা শোনে )

শিক্ষক: আপনার সাথে একটা কথা আলাপ করবার জন্য আবার ফিরে এলাম। আপনার ছেলেতো গোঁ ধরেছে সে আমার সাথে পাহাড়ে যাবে। আমি ওকে অনেক বোঝালাম যে, তোমার অসুস্থ্য মাকে একা ফেলে তুমি কোথাও যেতে পার না। তাছাড়া পাহাড়ে চড়া, সেতো ভীষণ কঠিন এবং সাংঘাতিক কাজ। ওকে বুঝিয়ে বললাম, তোমার মত এত অল্প বয়সে আমাদের সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া উচিৎ নয় এবং সম্ভব নয়। আপনার ছেলে বলে ও পাহাড়ের ওপাশে নীচের শহরটাতে যেতে চায়, ওখানকার জ্ঞানি ডাক্তারদের কাছ থেকে আপনার জন্য ঔষধপত্র নিয়ে আসতে চায়।
মা: বেশ, আমি আপনার মুখে সব কথা ভাল করে শুনলাম। আমি আর এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করবো না, জানতে চাইবো না ও আপনাকে আর কি কি বলেছে–এই মারাত্মক কঠিন পর্বতআহরনে ও আপনার সাথে স্বাচ্ছন্দে যেতে পারে। ভেতরে আসো পুত্র
বালক ২নং স্পেসে এসে ঢোকে।
তোমার পিতা মারা যাওয়ার
সেই চরম দিন থেকে আজ অবধি
কেউ আমার পাশে এসে দাড়াঁয়নি
ভাবিনি কখনো তুমিও
আমায় ছেড়ে এত দূরে, চোখের আড়ালে যাবে
আমি নিঃশ্বেষ হবার আগে, আজো
তোমার খাবার আমি খাইয়ে দিই,
তোমায়ে পোশাক আমি পরিয়ে দিই
আমিই সব কিছু সামলাই
বালক: মা, তুমি যা যা বলেছ, সবই ঠিক কথা…তবু বলি, আমি বুঝি, আমার দ্বায়িত্ব, সেতো আমায় পালন করতেই হবে, মা
বালক, মা আর শিক্ষক:
আমাকে (ওকে) যেতেই হবে সেই দুর্গম বন্ধুর পথ বয়ে
তোমার (আমার, ওর) মৃত্যু ব্যাধির নিরাময়ে
যাবো ঐ পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ওপাশে নীচের শহরে এক কাজে
যাবো ধন্বন্তরীর ওষুধ আর পত্থির খোজেঁ

কোরাশ:
এত ক্ষণে ওরা বোঝে আর কোন অজুহাত
রুখতে পারবে না এই বালকের পথ
তাই ওর শিক্ষক আর ওর মা বলে ওঠে এক সাথে
এক সুরে:
শিক্ষক, মা:
দেখ দেখ ওর যুক্তির একি শক্তি
অনেকে বলতে পারে এ যে ডুমুর গাছের ফুল, তবুও বালক
যুক্তি দিয়ে বলে না মায়ের রোগ শয্যার কথা
বরং বার বলে মায়ের নিরোগ হবার কথা
কোরাশ:
যুক্তির বাধনে পড়ে মা তাই বলে
মা:
শরীরে আর বল নেই মা
যেতেই যদি হয় তবে যা
তবে তাড়াতাড়ি ফিরো বাছা তাড়াতাড়ি ফিরো
সব বাধা তুচ্ছ করে তুমি তাড়াতাড়ি ফিরো
২য় অংক
দরজাটা সরাতে হবে। মঞ্চের ডান পাশটা স্তরে স্তরে আরোহী প্লাটফর্মে পূর্ণ, তাতে সিড়ির চড়াই অনুসারে উপর নির্দেশ করা। ১নং স্পেসের বাম পাশের মঞ্চ র্বোর্ড ঝোলানো, তাতে লেখা ‘পাহাড়ের পথ’। ডান দিকে (উচু স্তর) বোর্ড ঝোলানো, তাতে লেখা ‘পর্বত চূড়া’। শূণ্য মঞ্চ।

কোরাশ:
পর্বোতারোহীর দল
এখন পাহাড়ে
শিক্ষকও আছেন সে দলে
সে দলে আছে বালকটিও
তবে সে বালক এ ভ্রমনে যোগ্য নয়
তার হৃদপিন্ডে চলছে মহা দন্দ
শরীর বাড়ী ফেরার জন্য খাড়া
খুব ভোরে সে চোখ মেলে দেখে মাথার উপর পাহাড়ের চূড়া
পা দুটো তার মজবুৎ করে
সে পাহাড়ের গায়ে গাথে

শিক্ষক আর ছাত্র তিনজন আসে ১নং স্পেসে, জাগ নিয়ে পিছু পিছু আসে আরেকজন।
শিক্ষক: খুব দ্রুতই চড়াই বেয়ে আমরা এই জায়গাটায়ে পৌছে গেলাম। এখন এখানে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই পারি, এই জায়গাটাকে বলা যেতে পারে হল্ট অর্থাৎ এখানে বিশ্রাম নাও।
তিনজন ছাত্র: আপনার কথা আমাদের শিরোধার্য।৭ <ওরা ২নং স্পেসে একটা পাটাতন বাধে। বালক শিক্ষককে ঘেসে দাড়ায়>
বালক: আমি একটা কথা বলতে চাই।
শিক্ষক: কী বলবে বল?
বালক: আমার শরীরটা ঠিক ভাল লাগছেনা।
শিক্ষক: চুপ! যারা আমাদের মত বিষেশ কোন কাজের উদ্দেশ্যে পাহাড়ে ভ্রমন করে, তাদে মুখে এ সব কথা বলা উচিৎ নয়। সম্ভবত তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছ, পর্বোতাহরনে তুমি অভ্যাস্ত নয়। এখানে শুয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। সুস্থ্য হয়ে উঠবে। (সে প্লাটফর্মে উঠে)
তিনজন ছাত্র: মনে হচ্ছে অল্প বয়সী বালকটা পাহাড় বেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চল স্যারের কাছে ব্যাপারটা শুনি গিয়ে।
কোরাশ: হ্যা, হ্যা তাই কর যাও।
তিনজন ছাত্র: (শিক্ষককে) আমাদের মনে হচ্ছে ঐ বাচ্চাছেলেটা পাহাড়ে চড়তে চড়তে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নাকি, ওর সমস্যা কী? আপনি কি ওকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন?
শিক্ষক: না, ওর শরীরটা একটু খারাপ লাগছে, ব্যাস। তাছাড়া ওর আর কোন বড় সমস্যা কিছু হচ্ছে বলেতো আমার মনে হয়না। পাহাড়ের চড়াই পথে উঠতে উঠতে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এখানে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই ও আবার একেবারে ঝরঝরে চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
তিনজন ছাত্র: অর্থাৎ, আপনি ওকে নিয়ে বিশেষ দু:শ্চিন্তা করছেনা, তাইতো?
শিক্ষক অনেকক্ষন যাবৎ চুপ করে থাকলেন, কোন কথা নেই কারো মুখে।
তিজন ছাত্র:৮ <একে অপরকে বলে>
শোন, শোন, বন্ধুগণ শোন দিয়া মন,
মোদের শিক্ষক মশাই কী কইলেন এখন
কী কইলেন এখন,
এই বালকটি ক্লান্ত নিছক পাহাড় চড়িয়া
তেমন কিছু নয় এ সামান্য বিষয়
নিছক ক্লান্ত হইছে ৯
নিছক ক্লান্ত হইলে কেউ কি এমন ম্লান হইয়া যায়?
ব্যাধি হইলে এই পাহাড়ে তার কি উপায়
বলেন তার কি উপায়
ঢাল বাইতে যদি এই হয় কারো এই অবধি
সামনে খাড়াই বাইলে তার কী হবে উপায়
দেখেন সবাই বুঝি!
দেখেন সবাই বুঝি!
এই পাহাড়ে কেউ কী কারো হয়
খাড়াই বইতে নিজে মরে
কারে কাধে কেবা ধরে
তাই পাহাড়ে নিয়ম আছে এক অতি প্রাচিন
নিয়ম অতি প্রাচিন
সেই নিয়মটা বড়ই কঠিন
বড়ই কঠোর
বড়ই নিষ্ঠুর
বাড়তি দেহ সব ফেলে দাও নীচে
পাহাড় তারে কোলে তুলে নেবে
বাড়তি দেহ সব ফেলে দাও নীচে
পাহাড় তারে কোলে তুলে নেবে, তাই নিক

<নিছক ক্লান্ত হইছে, ক্লান্ত হইছে, তা বিষেশ কিছু নয়?
ব্যাধি হইলে এই পাহাড়ে তার কি উপায়
বলেন তার কি উপায়
পাহাড় বাইতে প্রথম প্রথম শরীর একটু খারাপ হইয়া যায়
সামনে খাড়াই বাইলে তার কী হবে উপায়
দেখেন সবাই বুঝি!
দেখেন সবাই বুঝি!
আশা করি এ শরীর-খারাপ তেমন কিছু নয়
ভাল কাজে আইছে সে যে দেহে যেন সয়
যদি তার দেহে না কষ্ট সয়
পাহাড়ে নিয়ম, তারে ফেলে যেতে হয়
তাকে নিয়ে যাওয়া নয
তাকে ফেলে যেতে হয়
নিয়ম বড়ই কঠোর
নীতি বড়ই নিষ্ঠুর
বাড়তি দেহ যে হেটে পারে না যেতে
পাহাড় তারে কোলে তুলে নেবে
তাকে ফেলে যেতে হয়
তাকে ফেলে যেতে হয়>
শোন, শোন, বন্ধুগণ শোন দিয়া মন,
পাহাড়ের নিয়মে পাহাড় চলে
তাই পাহাড় মজবুত এমন
তারে বলি অচলায়তন
বলি অচলায়তন
সবাইকে নিচে ১নং স্পেসে ডাকা হয়, সবাই সবার হাতটা মুখে চোঙ্গের মত করে ধরে:
তুমি কি খুব অসুস্থ, উপরে উঠতে পারবে?
বালক: তোমরা এখনো আমাকে এখানে দাড়িঁয়ে থাকতে দেখছো। অসুস্থ হলে কি আমি বসে পড়তাম না?
নিস্চুপ কিছুক্ষন। এক সময় বালকটি মাটিতে বসে পড়ে।
<চল শিক্ষকের কাছে জানতে চাই।>

তিনজন ছাত্র: চল আমরা বরং শিক্ষককের সাথে ব্যপারটা আলাপ করি, সেটাই ভাল হবে। স্যার আপনার কাছে যখন বালকটার ব্যাপারে জানতে চাইলাম, আপনি বললেন ও পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠে সামান্য একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এখনতো ওকে দেখে অন্য কিছু মনে হচ্ছে। এখনতো সে উঠে দাড়াতেও পারছে না।১০ আর ভয়ে ভয়ে বললাম: অতি প্রাচীন কাল থেকে একটা প্রথা চলে আসছে যে, পাহাড় ডিঙ্গাতে অপারক ব্যাক্তিকে অবশ্যই পাহাড় থেকে নীচের উপত্যাকায়ে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে।
শিক্ষক: কী, তোমরা এই বালককে পাহাড়ের উপর থেকে নিচে উপত্যকায়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে? <দেখছি ও ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এই খাড়াইটুকু ওকে সবাই মিলে পার করিয়ে দেবার চেষ্টা কর।>
তিনজন ছাত্র: হ্যা, স্যার ঠিক আমরা তা-ই বলছি ।<হ্যা আমরা একটু চেষ্টা করে দেখি।
মঞ্চ: ছাত্র তিনজন বালকটাকে বয়ে নিয়ে খাড়াইটা পার করবার চেষ্টা করে। অভিনেতারা পাটাতন, দড়ি, চেয়ার আর এ রকমের কিছু জিনিম দিয়ে একটা শরু পহিাড়ি খাড়াব পথের মত সেট তৈরি করে, যাতে ছাত্র তিনজন নিজেরা নিজেরা একাকি পার হয়ে যেতে পারে, তবে বালবকে কাধে নিয়ে ওনা পার হতে পারেনা।
ছাত্র তিনজন: ওকে নিয়ে আমরা এ খাড়াই পার হতে পারছিনা, আবার ওর সাথে এখানে থেকে যেতেওতো পারছিনা। যাই হোক না কেন আমাদের এগিয়ে যেতেই হবে, আমরা যে ওষুধ সংগ্রহ করতে যাচ্চি, তার জন্য আমাদের গোচা শহর উন্মুখ হয়ে বসে আছে। খুবই কষ্টের সাথে বলতে হবে, ও যদি আমাদের সাথে নিজের পায়ে হেটে চলতে না পারে, তাহলে এই পাহাড়ের বুকে এখানেই ওকে ফেলে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।>
শিক্ষক: হ্যা অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটা মহৎ প্রথা, সত্য। হ্যা, আমি এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে পারছিনা। <হ্যা, হয়তো তোমরা তাই করবে। তাতে আমি কোন প্রতিবাদ করতে পারি না। আমার ধারনা তোমরাই ঠিক।> তবে এই প্রাচীন প্রথাতেই এ কথাও বলা আছে যে, অপারক বিফল ব্যাক্তির কাছে গিয়ে জানতে চাইতে হবে যে তার কারনে অক্রতকার্য্য হয়ে সবাই ফিরে যাবে কিনা। ঐ ছোট্ট জীবটার জন্য আমার হৃদয় এখন দুঃখে ভারাক্রান্ত। আমি এখন ওর কাছে গিয়ে অবশ্যই সব খোলসা করে খুলে বলবো, শান্ত ভাবে বোঝাবো এই মহৎ প্রথার মর্ম কথা।
কোরাশ: হ্যা আপনি তাই করুন।
তিনজন ছাত্র: (একে অপরের মুখো মুখি দাঁড়িয়ে)
এবার চলো ওর কাছে জানতে চাই ও কি চায়
ওর বিফলতায় সবাই কি ফিরে চলে যাবো?
তবে একটা কথা মনে রাখ যদি ও তাই চায়
তবু মোরা ফিরবোনা কিছুতেই
বরং ওকে ফেলে দেবো পাহাড়ের বুকে। ১১
<বরং ওকে রেখেই চলে যাবে বহু দূরে পাহাড়ের বুকে>
কোরাশ:
ওরা ছেলেটার কাছে জানতে চায়: ও কি চায়
সবাই কি ফিরে চলে যাবে ওর সাথে?
তবে ওরা আরো বলে: সে যদি চায়
তবু তারা ফিরবেনা এ পাহাড় ছেড়ে
বরং ওকে ফেলে দেব এই পাহাড়ের বুকে।১২
<বরং ওকে রেখেই চলে যাবে বহু দূরে পাহাড়ের বুকে>

১০

শিক্ষক বালকটির কাছে ১নং স্পেসে নেমে আসে
শিক্ষক: আমার কথা মন দিয়ে শোন,১৩ এখানে পাহাড়ে অতি প্রাচীনকাল থেকে একটা প্রথা চলে আসছে, যে পাহাড় আরোহনে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অবশ্যই পাহাড়ের এই গভীর খাদে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে–অর্থাৎ ততক্ষনাৎ মৃত্যু। <যেহেতু তুমি এখন অসুস্থ্য আর হেটে একপাও চলাচল করতে পারছো না, তাই তোমাকে এখন ফেলে রেখে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কোন উপায় নেই।>তবে এই প্রাথায়ে আরো বলা হয়েছে যে, অসুস্থ লোকটার কাছে জানতে চাইতে হবে: আমরা সবাই কি আবার সেই কারনে ফিরে চলে যাবো? ঐ প্রথাতে আরো বলা আছে, অসুস্থ্য লোকটার মুখে রবে বিজয়ীর হাসি, তার উত্তর হবে, না, আমার কারনে সবারকে ফিরে যেতে হবে না।
বালক: বুঝেছি স্যার।
শিক্ষক: তুমি কী চাও তোমার কারনে আমরা সবাই বাড়ী ফিরে যাই?
বালক: না, আপনারা ফিরবেন কেন?
শিক্ষক:১৪ তাহলে কি তুমি চাও সবার সাথে আগে যেমন ঘটেছে তোমার বেলায় তাই ঘটে যাক? <তাহলে কি তুমি চাইছো যে তোমাকে এখানে একা ফেলে রেখে সবাই সামনে এগিয়ে যাক?>
বালক: অবশ্যই। <আমি আবার একবার চিন্তা করতে চাই। বালক নিরব, কিছুক্ষণ চিন্তা করে। হ্যা, আমি মনস্থির করেছি, আপনারা এগিয়ে যান>
শিক্ষক: (সবাইকে উপরে ডাকে): এখানো সবাই আসো! আমার কাছে ও হ্যা বলেছে, অর্থাৎ প্রথা অনুসারে সে উত্তর দিয়েছে। <১নং স্পেস ২নং স্পেসে ডাকে) : ও ঠিক ঠি উত্তর দিয়েছে>
তিনজন ছাত্র: আমাদের কাছে ও হ্যা বলেছে। প্রথা অনুসারে সব ঠিক হয়েছে।
বালকটিকে ওরা ২নংস্পেসে তুলে নিয়ে আসে।।
<কোরাশ আর তিনজন ছাত্র ২নং স্পেসে যেতেযেতে: ও হ্যা বলেছে হ্যা। চল!
ছাত্র তিনজন তখনো দাড়িয়ে।
শিক্ষক:
এবার চলো, চলো, আর নেই কোন দিধা
লক্ষ্যে পৌছুতেই হবে, নেই কোন বাধা
ছাত্র তিনজন তবু তখনো দাড়িয়ে।
বালক: আমি কিছু কথা বলতে চাই: আমাকে এখানে একা শুইয়ে ফেলে রেখে তোমরা সব এভাবে চলে যেওনা, দয়া কর, দয়া করে আমায় ঐ নীচে পাহাড়ের গভীর উপতাখ্যায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে যাও, আমি একাকী এভাবে মরতে বড় ভয় পাই।
তিনজন ছাত্র: আমরা তা’ করতে পারবোনা কিছুতেই।
বালক: দাড়াঁও! আমার দাবী তোমাদের মানতেই হবে।
শিক্ষক:
ওকে এখানে রেখে যেতে হলে, ওর দাবী মেনে নাও
ভাগ্য রচনা বড়ই সহজ
কার্য্য করার চেয়ে
তোমরা কি এখন প্রস্তুত ওকে ছুড়ে পাহাড়ের বুকে ফেলে দিতে?
তিনজন ছাত্র: হ্যা>
আমাদের হাতে তোরার মাথা ছেড়ে দাও
শরীর মোটেই শক্ত করো না
আমরা তোমায় বয়ে নিয়ে যাবো খুব যতনে
ছাত্র তিনজন বালকটিকে পাটাতনের এক পাশে নিয়ে যায়। বালকটির সামনে দাড়ায়, তাকে ঢেকে দেয়।
বালক(চোখের আড়ালে)
খুব ভালো করে জানি এ অভিযান যদি শেষ করে যেতে চাই
আমি শেষ হয়ে যাবো এ পথ শেষ হবার আগেইে
এখন চোখ বুজলেই দেখি আমার মাকে
আমার রোগে ভোগা মাকে
তার রোগ শোক নাশে আসেছি তোমাদের সাথে
আমার এ সব আরোহী পোশাক তাকে সপেঁ দিও
আর সাথে দিও নিরাময় বানী যেন সে না কাদে
আমার রোগে ভোগা মা যেন সে না কাদেঁ
তোমরা যে যার বাড়ি ফিরে শেষে আমার এ খবর দিও
কোরাশ:
এবার তার বন্ধু সবাই দড়া-দড়ী নিল খুলে
তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেখে নিল পৃথিবীর নির্মম পথ, কিছু ঝুকে
তারপরো দেখে নিল তিক্ত সে পথ, দুই চোখে
তারপর ওরা ওকে ছুড়ে ফেলে দিল নীচে, বহু নীচে।
পায়ে পায়ে তারা যেন গিঁট বেধেঁ দাঁড়ালো শক্ত পায়ে
চোখ মেলে থাকে রাক্ষসী উপতখ্যায়ে

য দি ব লে না

১০

শিক্ষক নীচের ১নং স্পেসে নেমে আসে
শিক্ষক: আমার কথা মন দিয়ে শোন, এখানে পাহাড়ে অতি প্রাচীনকাল থেকে একটা প্রথা চলে আসছে, যে পাহাড় আরোহনে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অবশ্যই পাহাড়ের এই গভীর খাদে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে–অর্থাৎ ততক্ষনাৎ মৃত্যু। তবে এই প্রাথায়ে আরো বলা হয়েছে যে, অসুস্থ লোকটার কাছে জানতে চাইতে হবে: আমরা সবাই কি আবার সেই কারনে ফিরে চলে যাবো? ঐ প্রথাতে আরো বলা আছে, অসুস্থ্য লোকটার মুখে রবে বিজয়ীর হাসি, তার উত্তর হবে, না, আমার কারনে সবারকে ফিরে যেতে হবে না। শুধু যদি আমি তোমার স্থানে হতে পারতাম, তাহলে মরেও কত না সুখী হতাম!
বালক: বুঝেছি স্যার।
শিক্ষক: তুমি কী চাও তোমার কারনে আমরা সবাই বাড়ী ফিরে যাই? নাকি তুমি চাও, প্রথা মত, তোমাকে এখন ছুড়ে ফেলে দেওয়া হোক এই গিরী খাদে
বালক(কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ): না আমি তাতে অনিচ্ছুক।
শিক্ষক (১নং স্পেস থেকে ২নং স্পেসে যায়।): নীচে নেমে চলো। ও প্রথামত উত্তর দেয়নি।
তিনজন ছাত্র (নীচে ১নংস্পেসে নেমে আসে।): ও না বলেছে, (বালককে): তুমি প্রথানুযায়ী উত্ত দিলে না কেন? প্রথমবারের উত্তর ক দিলে দ্বিতীয়বারের উত্তরে অবশ্যই বলতে হবে খ , প্রথমেই তোমার কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই ভ্রমনকালীন অবস্থায়ে তোমার যাই হোক হয়েছিল তুলি বললে হ্যা।
বালক: আমি ভুল উত্তর দিয়েছিলাম, তবে তোমাদের প্রশ্নটাওতো তেমনই ভুল। প্রথমবারের উত্তর ক দিলে দ্বিতীয়বারের উত্তরে কেউ খ নাও বলতে পারে। যে বুঝতে পারছে ক উত্তরটা ঠিক নয়। আমি আমার মায়ের জন্য ওষুধ খুজতে এসেছি, তবে এখন আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছি, ফলে আর এগিয়ে যেতে পারছিনা। ফলে নতুন পরিস্থিতিতে পড়ে আমি এখন দ্রুত ফিরে যেতে চাই। এখন আমি তোমাদেরকেও বলছি তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়ী ফিরে চলো। তোমাদের গবেষণার কাজ কিছু দিন স্থগিত রাখা সম্ভব। য়দি আসলে পাহাড়ের ওপাশে শিক্ষার কিছু থেকে থাকে, যেমন আমরা আশা করছি, আমাদের পরিস্থিতির বিবেচনায় এই মুহূর্তে অবশ্য ফিরে চলে যাওয়া উচিৎ। আর যে প্রাচিন প্রথার কথা তোমরা বলছো তার হাতা মাথা কোন যুক্তিতে আমি ফেলতে পারছি না। বরং আমি এর বদলে আশা করি এমন এক নতুন মহৎ প্রথার, যা যুগ উপযোগী, এই মুহূর্তে যা ব্যবহার করতে পারি, যে প্রথায় প্রতিটি নতুন পরিস্থিতিতে নতুন ভাবে চিন্তা করতে দেয়।
তিনজন ছাত্র (শিক্ষককে) আমাদের এখন কি করা উচিৎ? এ বালক যা বললো তা মোটেই নায়কচিত নয়, তবে তা আমাদের বুদ্ধি বিবেচনায়ে একেবারে স্পষ্ট।
শিক্ষক: তোমরা অবশ্যই নিজেরা সিন্ধান্ত নেবে। তবে তোমাদেরকে আমি একটা কথা বলে দিতে চাই, এভাবে ফিরে গেলে কন্তু তোমরা সাধারন লোকদের কাছে হাস্যপদ এবং অপমানের পাত্র হয়ে উঠবে।
তিনজন ছাত্র: নিজের জন্য নিজে কথা বলা কিছুতেই মর্যাদাহানিকর হতে পারে না।
শিক্ষক: না আমি তাতে মর্যাদাহানিকর কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
তিনজন ছাত্র: তাহলে চলো আমরা ফিরে যাই, আর কোন লোকচক্ষুর সংসয় বা অপমানের ভয় আমাদের বুদ্ধি বিবেচনার কাজে বাধা সাধতে পারবেনা। কোন প্রাচীন নিয়ম-প্রথাই আমাদের সঠিক চিন্তা-চেতনা গ্রহণে বাধা দিতে পারবেনা।
আমাদের হাতে তোরার মাথা ছেড়ে দাও
শরীর মোটেই শক্ত করো না
আমরা তোমায় বয়ে নিয়ে যাবো খুব যতনে
কোরাশ:
এভাবেই বন্ধুরা তাদের বন্ধুকে বয়ে নিয়ে যায়
পৃথিবীতে গড়ে তোলে নতুন প্রথা
পৃথিবীতে গড়ে তোলে এই নতুন নিয়ম
সেই বালককে নিয়ে তারা ঘরে ফিরে যায়।
পাশাপাশি হাটে তারা এক সাথে
কাধে কাধে হটায় তারা যত অপমান
কাধে কাধে সরায় তারা সব অপবাদ
লোকের কথায়ে কাবু তারা হয়নাকো আর।

ভাষান্তর: আশরাফ-উল আলম শিকদার

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *