দ্য স্ফিংস উইদাউট এ্য সিকরেট, অস্কার ওয়াইল্ড

এক বিকেলে বসে আছি প্যারিসের কাফে দি লা পেইক-এর বাইরের দিকে। রাস্তায় লোকজনের চলাচল দেখছি। অবাক হয়ে ভাবছি, অনেক মানুষই তো খুবই ধনী তাহলে কিছু মানুষই বা এত দরিদ্র হবে কেনো।
এমন সময় মনে হলো কে যেন নাম ধরে ডাকল আমায়।

পেছন ফিরে দেখি লর্ড মার্চিশন। এক সাথে আমরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তান, ছাড়ার পরে আর দেখা হয়নি; তাও তো প্রায় বছর দশেক। তাকে দেখা আমি খুব খুশি হয়ে উঠলাম। হাত মেলালাম দুজনে বেশ খোশ মেজাজে।
অক্সফোর্ডে থাকতেই ওকে আমার খুব ভালো লাগতো। আমরা বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠে ছিলাম। ও তখন হ্যান্ডসাম, প্রাণচঞ্চল আর ভারী সৎ একজন যুবক। সবাই বলাবলি করতাম সব সময় এমন সৎ হয়ে না থাকলে কিন্তু ছেলেটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারবে এক দিন। তবে আমার ধারণা ওর এত প্রশংসা করতো সবাই ওর ঐ সততার জন্যেই।

এখন, এই দশ বছর পর ওর দিকে তাকিয়ে মনে হলো ও কিছুটা বদলে গেছে। কেমন যেন উদ্বিগ্ন, চিন্তান্বিত মনে হলো। কী নিয়ে যেন সে সন্দেহে ভুগছে। আমার তো মনে হয় না ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে ও কোনো দ্বিধাদ্বন্দে আছে; ও সব নিয়ে ওর একেবারে নিজেস্ব পাক্কা মতামত আছে। আমি নিশ্চিন্ত হলাম যে নিশ্চয় কোনো নারীঘটিত ব্যাপার-স্যাপার।
জিজ্ঞাসা করলাম বিয়ে-সাদি করেছে কি না।

উত্তর দিলো, “মেয়েদেরই ভালোভাবে বুঝতেই পারি না, বিয়ে করবো কাকে।“

“জেরাল্ড, দোস্ত আমার,“ বললাম, “ আমাদের কাজ মেয়েদের ভালবাসা, ওদেরকে বোঝা বুঝির তো দরকারই নেই।“ “যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারবো না তাকে আমি ভালবাসতেও পারবো না,“ এই হলো ওর উত্তর।

“মনে হচ্ছে জীবনের কী একটা রহস্য যেন তুমি গোপন করছো, জেরাল্ড। আমাকে সব খুলে বল।“
“চল, একটু ঘুরে-টুরে আসি গাড়িতে করে; ড্রাইভ।“ উত্তর দিলো ও। “এই জায়গাটা না বড় গ্যাঞ্জম। না, না, ওই হলুদ গাড়িটা বাদ দাও–ঐ যে, ঐ ঘন সবুজ গাড়িটা চলতে পারে।“

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চলে গেলাম ক্যাফে থেকে বেশ অনেকটা দূর। জানতে চাইলাম, “আমরা যাচ্ছিটা কোথায়?“
ও বলল, “যে খানে ইচ্ছে চলো; আমার কোনো অসুবিধে নেই।“ একটু থেমে আবার বললো “চলো, বোইস ডি বোলোনের কোনো রেস্তোরাঁয় চল? ওখানে আমরা ডিনারটা সেরে নেবো, আর তুমি তোমার কথা শোনাবে।“
বললাম, “আগে তোমার কাহিনি শুনবো তাপর অন্য কথা। একটু ঝেড়ে কাশো তো এবার। রহস্যটা কী?“
জেরাল্ড টুক করে পকেট হাত ঢুকিয়ে ছ্ট্টে একটা চামড়ার কেস বের করে আমার হাতে দিলো। খুললাম। ভেতরে একজন নারীর ছবি। বেশ লম্বা এবং সুন্দরী, মাথায় দীর্ঘ লম্বা চুল, আর নেশা ধরানো বড় বড় দুটো চোখ। পরনের পোশাক আশাক দেখে মনে হচ্ছে খুব দামি।
“চেহারা দেখে কী মনে হয় তোমার? সত্?“
ছবিটা খুব মনযোগ দিয়ে কিছুক্ষণ দেখলাম। ছবির চেহারা দেখে মনে হল মহিলার মধ্যে কী যেন একটা গাপন রহস্য লুকিয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে না রহস্যটা ভালো না মন্দ। তাঁর সৌন্দর্যটাই বেশ রহস্যময়। তার ঠোঁটে লেগে থাকা নিস্তেজ হাসি দেখে আমার মনে হলো চাঁদনি রাতে মিশরীয় স্ফিংস দেখছি। নাকি যে রহস্যময় হাসিটা প্যারিসের ল্যুভরে দেখতে পাওয়া যায় লিওনার্দর পেনিটং, মোনা লিসায়?
জেরাল্ড একটু অস্থির, জানতে চাইলো, “কী ভাবলে বলো?“
“সুন্দরী স্ফিংস।“ বললাম, “এর কথা কী জানো বলো তো সব।“
“আগে খাওয়া-দাওয়ার কাজটা সেরে নিই।“
ডিনার শেষ করে কফি আর সিগারেট খাচ্ছি। আবারও মনে করিয়ে দিলাম কথাটা। তারপর জেরাল্ড এই কাহিনিটা বললো:
“একদিন বিকেল বেলা,“ ও গল্পটা শুরু করলো, “পাঁচটা-টাঁচতা বাজে লন্ডনে, বন্ড স্ট্রিটের হাঁটছি। চারপাশের অনক গাড়ি ঘোড়া, ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার দিকে রাস্তায় ছোট খাটো একটা হলুদ গাড়ি, কী জানি কেন সে দিকে আমার নজর আটকে গেলো। গাড়িটা চলে যাচ্ছে, আমার চোখে পড়লো ঐ মুখটা। একটু আগে ছবিতে তুমি যাকে দেখলে সেই নারীর মুখ। সরাসরি আমার হৃদয়ে গিয়ে পৌছালো মুখটা। সে দিন সারা রাত, পরের সারাটা দিনই সেই মুখটা কথা ঘুরে ফিরে আমার মনে পড়তে লাগলো। বারবার আমি রাস্তা ঘাটে, সাধারন জায়গাগুলিতে হলুদ গাড়ীর খুঁজে বেড়াতাম। কোথাও খুঁজে পেলাম না। ভাবতে শুরু করলাম সেই অপরিচিত সুন্দরীকে আমি স্বপ্নেই দেখেছি।
“প্রায় সপ্তাহ খানেক পর একদিন, মাদাম দি রাসটেল-এর সাথে ডিনার করবার জন্যে গিয়েছিলাম। ডিনার ছিল আটটা, সাড়ে আটটা বেজে গেল। তখনো আমরা বসার ঘরে বসেই আছি। শেষে একজন চাকর দরজাটা হাট করে খুলে দিয়ে বললো, “লেডি অ্যালরয়“। মহিলা ঢুকলেন ঘরে – এই মহিলাকেই আমি এতদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি! এই সেই হলুদ গাড়ির সুন্দরী।
ধীরে ধীরে বসবার ঘরটাতে ঢুকে এলো সে, ধূসর পোশাকে তাকে দারুন দেখাচ্ছিল। মাদাম দি রাসটেল আমাকেই বললেন লেডি অ্যালরয়কে ডিনারে নিয়ে যেতে, আমি তো আনন্দের শীখরে পৌছে গেলাম । খাওয়ার টেবিলে লেডি অ্যালরয় বসলেন পাশেই।
‘খেতে বসে পড়ার পরে আমি একেবারে সরল মনে বলে ফেললাম, “লেডি অ্যালবয়, মনে হয় দিন কয়েক আগেই একবার আমি আপনাকে বন্ড স্ট্রিটে দেখেছি।“
‘ম্লান হয়ে গেলো সে গলা নামিয়ে আমাকে বললো, “প্লিজ এত জোর কথা বলেন না। আশে-পাশে কেউ শুনছে হয়তো।“
‘আলাপের শুরুতেই এমন কান্ড, আমার একটু খারাপই লাগলো। কথা ঘুরিয়ে আমি ফরাসি নাটক আর যত সব আলতু ফালতু ব্যাপারে আলোচনায় মেতে উঠলাম। ও তো কথা প্রায় কিছু বলছেই না। কথা বলে একেবারে আস্তে তবে কন্ঠ বেশ সুরেলা। মনে হলে ভয় পাচ্ছে, পাছে বুঝি কেউ তাঁর কথা শুনে ফেলে।
‘পাগলে মতো আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম। উত্তেজনা বেড়ে গেলো ওর চারপাশের রহস্যের কথা ভেবে ভেবে। আমার কৌতূহল ক্রমে আরো বেড়ে গেলো — তখন আরো জানতে ইচ্ছে করছে — কী এই নারীর চারপাশের রহস্য।
‘ডিনার শেষ হওয়ার সাথে সাথে উঠে পড়লো। চলে যাচ্ছে দেখে জানতে চাইলাম,
পরে তার সাথে দেখা করতে যেতে পারি কিনা। একটু চুপচাপ হয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো আশে পাশে কেউ নজর রাখছে কি না। তারপর বললো, “আসুন, কাল বিকেল পৌনে পাঁচটায়।“
‘মাদাম দি রাসটেলকে অনুরোধ করলাম, লেডি অ্যালরয়ের ব্যাপারে কিছু কথা জানাবার জন্যে। কানে গেলো শুধু যে ওর স্বামী মারা গেছেন, আর সে লন্ডনের খুব মূল্যবান এলাকার সুন্দর একটা বাড়িতে সে এখন থাকে। এসব শুনে-টুনে কিছুক্ষণ থেকেই বাসায় ফিরে গেলাম।
পরের দিন ঠিক পৌনে পাঁচটায় আমি লেডি অ্যালরয়ের লন্ডনের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। বাড়ির কাজের লোককে বললাম লেডি অ্যালরয়ের সাথে দেখা করতে চাই। কথা শুনে সে জানালো এই কিছুক্ষণ আগেই সে বেরিয়ে গেছে।
‘ক্লাবে চলে গেলাম, ভীষণ দুঃখ, বিভ্রান্ত। অনেক ভেবেচিন্তে একটা চিঠি লিখে দিলাম, জানতে চাইলাম অন্য কোনো দিন এমন বিকালে আবারো আসতে পারি কিনা।
‘বেশ অনেক দিন কোনো উত্তর পেলাম না, তবে অবশেষে একটা টিঠি পেলাম। তাতে বলা আছে রোববার চারটে সময় দেখা করতে যেতে পারি। টিঠিটার শেষে অদ্ভুত নির্দেশ দেওয়া: “অনুগ্রহ করে এই ঠিকানায় আর আমাকে চিঠি পাঠাবেন না।“ বলেছে, “দেখা হলে সব খুলে বলবো।“
‘রোবার আমি গেলাম, ও বাড়িতেই ছিল। অমাইক ব্যবহার, আমি মুগ্ধ হলাম। তবে উঠে আসবার সময় ও বললো, “আমাকে আবার কখনো চিঠি দেওযার প্রয়োজন হয় তাহলে এই ঠিকানা না পাঠিয়ে পাঠাবেন: মিসেস নকস, উইটেকার‘স লাইব্রেরি, গ্রিন স্ট্রিট। বাড়িতে আমার কোনো চিঠিপত্র না আসাই ভালো, অনেক কারণ আছে।“
‘তারপরে প্রায়ই ওর সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়। দিনে দিনে সে আমার কাছে আরো বেশি মনোমুগ্ধকর এবং রহস্যময় হয়ে উঠতে লাগলো। মাঝে-মধ্যে মনে হয়েছে কোনো পুরুষের খপ্পরে পড়েছেন হয়তো। না ঠিক বিশ্বাসও হয়ে ওঠে না ব্যাপারটা।
‘শেষে একদিন আমি মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, ওকে আমার স্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেব। লাইব্রেরির ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়ে দিলাম ওর কাছে। জানতে চাইলাম, পরের সোমবার ছটা সময় ওর সাথে দেখা হতে পারে কিনা। উত্তর পাঠালো, হ্যা, দেখা হতে পারে। আমি তো একেবারে আনন্দে আত্মহারা। আমি আসলেই খুব … খুবই ভালবেসে ফেলেছি ওকে, বুঝলে। ওর চারপাশের রহস্য আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে মনে হতে পারে; না,না, এক্কেবারেই কিন্তু তা ঠিক নয়! আমি ওই নারীটাকেই ভালবেসে ফেলেছি। ওর রহস্যময়তায় আমি ভিত, ঠিকই। আমার ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ বড়ে ওঠে।‘
আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘তার মানে তুমি রহস্যের জট খুলে ফেলতে পেরেছো?‘
‘মোটামুঠি,‘ উত্তর। ‘সোমবার রিজেন্ট পার্কে কাকার বাড়িতে গিয়েছিলাম লাঞ্চ করতে। খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু হাঁটা-হাঁটি করাটা আমার অভ্যাস। ভাবলাম হেঁটে পিক্যাডিলিতে যাবো। যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা মানে টুক-টাক ছেটে-খাটো কয়েকটা অলি-গলি। তেমনি একটা রাস্তা ধরে যাচ্ছি হঠাৎ দেখি লেডি অ্যালরয় একেবারে আমার সামনে। তার মুখটা মাথার বিশাল টুপিতে অর্ধেক ঢাকা পড়ে আছে, তবে আমার চিনতে কোনো ভুল হয় নি।
‘লেডি অ্যালবয় হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাটার শেষ বাড়ির কাছে এসে সিঁড়ি দিয়ে ক-ধাপ উঠে গেল সদর দরজায়। ব্যাগ থেকে একটা চাব বের করে নিয়ে, দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলো।
‘মনে মনে বললাম, “ও, এই তাহলে আসল রহস্য!“ তারপর আমি চট করে গিয়ে দাঁড়ালাম বাড়িটার সামনে। দেখে মনে হল ভাড়া নেওয়া বাড়ি মতো।
‘চাবী বের করবার সময় কখন যেন তার রোমালটা পড়ে গেছে। দরজার কাছে দেখি রুমালটা পড়ে আছে। সেটা তুলে নিয়ে পকেটে রেখে দিলাম।
`ছ`টায় তাঁর সঙ্গে দেখা হলো, যাবার কথা হয়েছিল আগে থেকেই। রূপালী একটা পোশাকে সে বসে ছিল সোফায়। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল তাঁকে।
“আপনাকে দেখে আমি ভালো লাগছে,“ ও বললো, “সারাটা দিনই বাড়িতে, আজ বের হই নি কোথাও।“
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর পকেট থেকে রুমালটা বের করে ওর হাতে দিলাম। খুব শান্ত, ঠান্ডা গলায় বললাম, “আজ বিকালে কুমনর স্ট্রিটে তুমি এটা ফেলে এসেছিলে, লেডি অ্যলরয়।“
‘ঝট করে মাথা তুলে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে, চোখে স্পস্ট আতঙ্ক। রুমালটা হাতে নিলো না। প্রশ্ন করলাম, “ওখানে গিয়েছিলে কেন?“
‘“আমাকে এই প্রশ্ন করার অধিকার কি আপনার আছে?“‘
‘“কোনো পুরুষ তোমাকে ভালবাসলে যে অধিকার পেতে পারে, সেই অধিকারে,“ বললাম।“ “আজ আমি এসেছিলাম তোমার কাছে জানতে যে আমার স্ত্রী হতে তোমার কোনো আপত্তি আছ কি না।“ ‘ও দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললে, দেখতে পাচ্ছিলাম ওর চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। বললাম, “সব কথা আমাকে বলো।“
‘ওর চোখে পানি, উঠে দাঁড়ালো, সরাসরি আমার দিকে ফিরে সঠান তাকালো আমার দিকে। “লর্ড লর্ড মার্চিশন,“ আস্তে-ধীরে বললো, “আপনাকে বলার মতো কিছুই না।“
‘“কার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো তুমি!“ চিৎকার করে উঠলাম। “এই তাহলে তোমার আসল রহস্য।“
‘হঠাৎ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো ও, তারপর বললো, “কারো সাথে দেখা করতে যাইনি।“ ‘বললাম “মিথ্যে কথা বলছো।“
‘ “আমি সত্যি কথাই বলছি।“
‘পুরোপুরি পাগল হয়ে উঠেছিলাম। জানি না কী বলেছি না বলেছি, তবে ওকে মারাত্মক জঘণ্য কিছু কথা বলে ফেলেছিলাম তো অবশ্যই। শেষে আমি রেগে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসেছি। পরের দিনই ওর একটা চিঠি পেলাম। সে চিঠি না খুলেই ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। তারপরেই অ্যালেন কোলভিলের সাথে বেরিয়ে পড়লাম নরওয়ের দিকে।
‘মাসখানেক পর নরওয়ে থেকে লন্ডনে ফিরে এসে একদিন মর্নিং পোস্টের রিপোর্টে জানতে পারলাম লেডি অ্যালবয় মারা গিয়েছে। এক সন্ধ্যায় থিয়েটার দেখতে গিয়ে নাকি প্রচন্ড ঠান্ডা লেগে গিয়েছিল। তার কিছুদিন পরেই মারা গেছে সে।
‘ঘরে থেকে বেরোলাম না কয়েকটা দিন; কারো সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ বা কথা-বার্তা নেই। সারাক্ণ চুপচাপ বসে থাকি; মন ভীষণ খারাপ। একেবারে ভেঙ্গে পড়লাম। খুবই ভালবাসতাম ওকে। পাগলের মতো ভালবাসতাম। ঈশ্বর! ঐ নারীকে আমি এত ভালবাসতাম!‘
“সেই বাড়িটার রাস্তায় — তুমি পরে গিয়েছিলে?“ জিজ্ঞাসা করলাম।
‘বললো, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম একবার।“ একটু থেমে আবার বলা শুরু করলো, “একদিন গিয়েছিলাম কুমনর স্ট্রিটে। সন্দেহ – অবিশ্বাস আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। দরজার টোকা দিলাম। একজন ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিলেন, তাকে দেখে শুনে বেশ সম্ভ্রান্তই মনে হলো। জানতে চাইলাম, কোনো ঘর-টর খালি পাওয়া যাবে নাকি, ভাড়া নিতে চাই।
‘খুব শান্তভাবে তিনি বললেন, “না, মানে বসবার কামরাটা একজন আসলে একজন ভাড়া নিয়ে রেখেছেন তবে সে মহিলার তো আর কোনো পাত্তা নেই গত তিন তিনটে মাস। তাঁর কাছে তিন মাসের ভাড়া পড়ে আছে, আসেও না ভাড়াও দেয় না। ওটা এখন আপনার কাছে ভাড়া দিয়ে দিতেই পারি মনে হচ্ছে।
লেডি অ্যালবয়ের ছবিটা ওনাকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই মহিলাটার কথা বলছেন নাতো?“
‘ “হ্যা, হ্যা এইতো, এইতো সেই মহিলা,“ চিৎকার করে উঠলেন। “কবে আসতে পারে বলেন তো?“ বললাম, “আর আসবে না, ও মারা গিয়েছে।“
‘ “কী বলছেন কী আপনি! মারা গেছে!“ আৎকে উঠলন মহিলা। “শুনে খুব খারাপ লাগছে। বেচারী কখনো সখনো এসে শুধু ঐ ঘরটাতে বসে থাকতো, সপ্তাহ তিন পাউন্ড করে ভাড়া দিতো আমাকে।“
‘জিজ্ঞাসা করলাম, “কারো সাথে দেখা করতে আসতো এখানে?“
‘ “না, না।“ মহিলা বললেন। “নাহ্। সবসময় একা একাই আসতো, কেউ কোনোদিন তার সাথে দেখা করতেও আসে নি এখানে।“ আমি বিরক্ত হয়ে গলা চড়িয়ে জানতে চাইলাম, “তাহলে এখানে এসে করতোটা কী?“
‘ “চুপচাপ বসে বই পড়তো,“ মহিলা বললেন। “মাঝে-মাঝে চা খেতো। তবে একা একা।“
‘কী বলবো বুঝতে পারলাম না। তার হাতে পাঁচ পাউন্ড ধরিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। এখন বলো, সব কিছুই তো শুনলে, এসবের মানেটা কী? কী মনে হয় মহিলার গল্পটা আসল সত্য? তুমি বিশ্বাস করতে পারছো?
বললাম ‘হ্যা, বিশ্বাস করছি,‘
‘লেডি অ্যালবয় সেখানে যেতো বসে বসে বই পড়তে!‘
‘দোস্ত,‘ বললাম, ‘লেডি অ্যালবয় একজন অতি সাধারন নারী, তার মধ্যে এক রকমের একটা রহস্যপনা লুকিয়ে রাখতে হতো। গোপনে লুকিয়ে ছুপিয়ে এখানে আসলে মনে মনে আনন্দ পেতো, তাই ঘরটা ভাড়া নিয়েছিল্য। নিজেকে সে কোনো কাহিনির রহস্যময় নায়িকা ভাবতে ভালবাসতো। গোপন রহস্যের দিকে তার একটা কৌতূহল ছিল, ভীষণ ভালবাসতো।
‘তুমি কি আসলেই তা-ই মনে করো?
‘ হ্যা সত্যি তা-ই মনে করি।‘
পকেট থেকে চামড়ার সেই ব্যাগটা বের করে, খুলে ছবিটা বের করে নিয়ে অনির্মেষ চেয়ে থাকলো। শেষে বললো, “কী জানি আমার তো বিশ্বাস হয় না কিছুতেই!

Please Post Your Comments & Reviews

Your email address will not be published. Required fields are marked *